
বিস্মৃতিচারণা – পর্ব (৮)
রাত্রে দেখা সুখস্বপ্ন যেমন কোনো ধারাবাহিকতার ধার ধারে না, ফেলে আসা বিস্মৃত সময়ের সুখস্মৃতিও ক্রমানুসারে মনের চালচিত্রে ধরা দেয় না. ওরা আসে কিছুটা অসংলগ্নতা নিয়ে, কিছুটা বিচ্ছিন্নভাবে। আপন খেয়ালে আপনিই ওরা আসে, আপনিই ভেসে চলে যায়।
বিস্মৃতিচারণার এই পর্বের সূচনায় যে প্রতিষ্ঠানটির কয়েকটি বার্ষিক অধিবেশনের মধুর স্মৃতিরোমন্থন আমার আলোচ্য বিষয়, ১০০ বছর পেরোনো বাঙালির সর্বভারতীয় সেই সংগঠনটির সম্পর্কে অনবহিত পাঠকদের দু’চার কথায় অবহিত করে নেওয়ার তাগিদ অনুভব করছি।

সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একটি বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান ‘নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন’। সারা ভারতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রসারে নিয়োজিত এই প্রতিষ্ঠান। ২০২২ সালে শতবর্ষের গন্ডী পেরোনো ঐতিহ্যবাহী এই বাঙালি সংগঠনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ, অতুলপ্রসাদ সেন, শরৎচন্দ্র, সরলা দেবী, অনুরূপা দেবী, কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, অন্নদাশঙ্কর রায় থেকে একালের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার প্রমুখ বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের বিশিষ্টজনেরা যুক্ত ছিলেন। সারা ভারতের বাঙালির অংশগ্রহণে এই সংগঠনের বার্ষিক সাহিত্য-অধিবেশনে অংশগ্রহণ ছিল সাহিত্যপ্রেমী বাঙালির কাছে ছিল পরম কাঙ্খিত।

পরপর দুটিপর্বের বিস্মৃতিচারণায় ১৯৭৬ সালে বোম্বাইয়ের মাটিতে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম শতবার্ষিকী সমাপ্তির অনুষ্ঠানের কিছু কাহিনি পরিবেশন করেছি। হঠাৎই স্মৃতিতে ফিরে এলো এক বছর আগে ১৯৭৫ সালের বর্ষশেষে ভাগলপুরে অনুষ্ঠিত বঙ্গ সাহিত্যেরই আর একটি আসরের স্মৃতিমেদুরতা। কিছুটা ইন্ধন জোগাল পুরোনো একটি লেখা, যেটির সহায়তা না পেলে হয়তো স্মৃতির এতটা পুনরুদ্ধার সম্ভব হত না।

সেটি ছিল শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম শতবর্ষের শুরুর আসর। অধিবেশন বসতে চলেছে শরৎবাবুর বাল্য, কৈশোর ও তারুণ্যের উপবন তাঁর মামার বাড়ির দেশ, ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের অন্যতম পটভূমি ভাগলপুরে।অতীতের বহু বরেণ্য বাঙালির বাসভূমিও এই ভাগলপুর। বনফুলের বহু উল্লেখযোগ্য সাহিত্য কীর্তির সৃষ্টি এখানেই।
সদ্য কুড়ি ছোঁয়া তরুণ তখন আমি। ততদিনে মোটামুটি পড়ে ফেলেছি শরৎচন্দ্রের গল্প উপন্যাসগুলো। পিতা প্রভাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের আগ্রহেই বাঙালির সর্ববৃহৎ ও বনেদী সাহিত্য সংগঠন নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের সদস্য হয়েছিলাম সেই বছরেই। আমার জীবনের প্রথম সাহিত্য অধিবেশনে যোগ দিতে পৌঁছলাম শরৎচন্দ্রের স্মৃতির শহর ভাগলপুরে।
জীবনে এই প্রথম একসঙ্গে এত বিশিষ্ট মানুষের সংস্পর্শে এলাম। সবচেয়ে বড় কথা, সকলেই ধরা ছোঁয়ার মধ্যে, সই সংগ্রহ থেকে শুরু করে ব্যাক্তিগত আলাপন, সবেরই বাধা বন্ধনহীন এক সুযোগ। মনে হল, যেন এক স্বপ্নের জগতে এসে পড়েছি।
আমাদের ঠাঁই হয়েছিল পরিপাটি একটি সাবেককালের ধর্মশালায়। পাশের ঘরের একক অতিথি ছিলেন ‘মেমসাহেব’ খ্যাত বিশিষ্ট সাহিত্যিক নিমাই ভট্টাচার্য। আমাদের সাধারণ সদস্যদের জন্য পাশাপাশি ঘরের মাটিতে পাতা সাদা কাপড়ে মোড়া মোটা গদিতে কয়েকজন করে সহযাত্রীর পরপর বিছানা। কনকনে শীতের রাত্রে রাতদুপুর পর্যন্ত তুমুল আড্ডা, ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতেও পরস্পরের পেছনে লাগা, ভোরে উঠে বিছানায় বসে ঘন দুধের অসামান্য চা পান। অতঃপর অধিবেশনে যোগদানের প্রস্তুতি। এ যেন কদিনের এক আনন্দ পাঠশালা।
হঠাৎ সেদিন ঊষালগ্নে ঘরের বাইরে থেকে শোনা গেল, সুদর্শন সাহিত্যিক নিমাই ভট্টাচার্যের আহ্বান, চলো হে, কে কে যাবে, ভোরের ভাগলপুরটা এক ঝলক দেখে আসা যাক!

আগাপাশতলা শীতের জামাকাপড়ে মুড়ে নিমাই বাবুর সঙ্গে কয়েকজন মিলে বেরিয়ে পড়া গেল মহানন্দে। এব্যাপারে বিপুল উদ্যম ছিল আমার অগ্রজ সঙ্গী তপনদা ওরফে শ্রী তপন চট্টোপাধ্যায়ের। জীবনে এই প্রথম এক জনপ্রিয় লেখকের সঙ্গে আমাদের প্রাতঃভ্রমণ। হাসিতে গল্পে আমাদের সদ্য আলাপের জড়তা কাটানো উচ্ছলতা। ফেরার পথে এক জায়গায় যেন লোভাতুর দৃষ্টি নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন নিমাই বাবু। পথপার্শ্বের দোকানে বড় কড়ায় জাল দেওয়া হচ্ছে দুধ। পাশেই ভাজা হচ্ছে রসালো জিলিপি। উত্তর ভারতের জনপ্রিয় দুধ-জেলাবি, স-সাহিত্যিক আমাদেরও রসসিঞ্চন করল। অমৃতের স্বাদ কখনও পাইনি, তবে হাড়-কাঁপানো শীতের সকালে নিমাই বাবুর উদ্যোগে ঘন দুগ্ধসিঞ্চিত জিলিপির আস্বাদন অমৃতবৎই মনে হয়েছিল।
ভাগলপুর মানেই শরৎচন্দ্রের মামার বাড়ি, শ্রীকান্ত আর ইন্দ্রনাথের দেশ, বনফুল ওরফে ডাক্তার বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের বাসগৃহ, চলচ্চিত্র জগতের অভিনেতা অশোক কুমার, পরিচালক তপন সিনহার বাড়ি, বিশিষ্ট বাঙালির আবাসের তালিকা বেশ দীর্ঘ। সেকালে কৌলিন্যে বাঙালির খ্যাতনামা প্রবাসভূমি হিসেবে ঘাটশীলা, পাটনা, বেনারসের পাশে ভাগলপুরের দাবি কম ছিল না!

প্রারম্ভিক প্রভাতী অধিবেশন শুরুর আগে শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্দেশ্যে পৌঁছনো গেল শরৎচন্দ্রের মামার বাড়িতে। মামা তদানীন্তন প্রখ্যাত সাহিত্যিক উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের পিতৃালয়, দাদামশায়ের এই গৃহেই শরৎচন্দ্রের জন্ম। কেটেছিল বাল্য, কৈশোর ও তারুণ্যের একটা বড় সময়ও। আলাপ হল উপেন বাবুর পুত্র, শরৎচন্দ্রের ভ্রাতুষ্পুত্র শান্তনু গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে। স্মৃতিবাহী বাড়িটি দেখার পর মাঠ পেরিয়ে উনি আমাদের নিয়ে গেলেন শ্রীকান্ত উপন্যাসের ইন্দ্রনাথ, বাস্তবের রাজু বা রাজেন্দ্রনাথ মজুমদারের বাড়িতে। আমাদের সাদর অভ্যর্থনা জানালেন ‘ইন্দ্রনাথে’র গর্বিত উত্তরাধিকারীরা। দূরে অঙ্গুলি নির্দেশ করে ওঁরা দেখালেন বাড়ির পাশ দিয়ে বহমান সেদিনের গঙ্গা নদী, যার ওপর দিয়ে ইন্দ্রনাথ শ্রীকান্তকে নিয়ে উজানে ডিঙি ভাসিয়ে দিত গভীর রাত্রে। সেই নদী তখন গতিপথ পরিবর্তন করে দূরবর্তী হয়ে গেছে। শ্রীকান্ত ইন্দ্রনাথের তরণী ভাসানোর যে ছবি মনের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে লালন করেছি, দূরবর্তী শীর্ণ জলরেখাটির দিকে তাকিয়ে এতকালের দৃশ্যকল্পটি ব্যাহত হওয়ায় বেশ কিছুটা আশাহত হলাম।

ছায়াচিত্রশিল্পী – সুব্রত মুখোপাধ্যায়
খ্যাতনামা অতিথিদের উপস্থিতিতে শুরু হল প্রারম্ভিক অধিবেশন।
সম্মেলন সভাপতি বিশিষ্ট প্রবীণ সাংবাদিক তুষার কান্তি ঘোষ ছাড়াও মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন শরৎচন্দ্রের স্নেহভাজন সেকালের সাড়া-জাগানো মহিলা কবি ও জন্মশতবার্ষিকী অধিবেশনের মূল সভাপতি রাধারাণী দেবী (কবি নরেন্দ্র দেবের স্ত্রী ও নবনীতা দেব সেনের মা), আশাপূর্ণা দেবী, আশালতা সিংহ, সুমথনাথ ঘোষ, নবনীতা দেবসেন, শঙ্কু মহারাজ, গজেন্দ্রকুমার মিত্র, নিমাই ভট্টাচার্য, শরৎচন্দ্রের জীবন ও সাহিত্য গবেষক গোপালচন্দ্র রায় প্রমুখ। উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার তপন সিনহাও।

ছায়াচিত্রশিল্পী – সুব্রত মুখোপাধ্যায়
রাধারাণী দেবী শরৎচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে শোনালেন জীবন ও সাহিত্যের বিবিধ ক্ষেত্রে মানুষ শরৎচন্দ্রের অন্তরঙ্গ পরিচয়। বিহারের তৎকালীন মূখ্যমন্ত্রী জগন্নাথ মিশ্র শরৎচন্দ্রের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে ঘোষণা করলেন যে ভাগলপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর বিভাগে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পঠনপাঠনের তিনি ব্যবস্থা করবেন।
তিনটি দিন ধরে ভিন্ন ভিন্ন পর্বে বেশ কিছু মনোগ্রাহী আলোচনা শোনা গেল।
‘শরৎচন্দ্র ও ভাগলপুর’ শীর্ষক আলোচনা করলেন গবেষক গোপাল চন্দ্র রায়, পুলকেশ দে সরকার প্রমুখ বিশিষ্টজন।

হিন্দী ভাষার প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও শরৎসাহিত্যের হিন্দী অনুবাদক হংসকুমার তিওয়ারি ও বিষ্ণু প্রভাকর আলোচনা করলেন ‘ভারতীয় সাহিত্যে শরৎচন্দ্রের প্রভাব’ বিষয়ে। ‘শরৎচন্দ্র ও নারীমুক্তি’ বিষয়ে অসামান্য বক্তব্য রাখলেন আশাপূর্ণা দেবী, আশালতা সিংহ, সুমথনাথ ঘোষ ও নবনীতা দেবসেন। ‘শরৎচন্দ্র ও বাংলা সাহিত্য’ বিষয়ে আলোচনা করলেন সাহিত্যিক মনোজ বসু, শঙ্কু মহারাজ, ভাষাবিদ ডক্টর অজিত কুমার ঘোষ প্রমুখ। শিশু সাহিত্য বিভাগে গজেন্দ্রকুমার মিত্র সরস আলোচনায় শ্রোতাদের রসসিক্ত করলেন ‘শরৎ সাহিত্যে শিশু ও কিশোর’ বিষয়ে।
সাহিত্য ও চলচ্চিত্র বিভাগে বৈদগ্ধ্যপূর্ণ ভাষণ শুনলাম প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার তপন সিনহার কণ্ঠে। মনে পড়ে গেল, মুগ্ধতা এসেছিল ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তপন সিনহার মার্জিত ও বিনয়ী ব্যবহারে। দাঁড়িয়ে ছবিও তুললেন আমাদের সঙ্গে।
সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার কিছু অনুষ্ঠান আজও স্মৃতিতে ভাসে। তার মধ্যে বিহার আর্ট থিয়েটার পরিবেশিত হিন্দী নাটক ‘পল্লীসমাজ’ এবং যান্ত্রিক গোষ্ঠীর পরিবেশনায় ‘বিজয়া’ নাটকটি মন ছুঁয়ে গিয়েছিল।
বঙ্গ সাহিত্যের এইসব আসরগুলো মনের মহাফেজখানায় যে কী সব সম্পদ রেখে যাচ্ছে, সেটা সেদিন ততটা বুঝিনি, যতটা আজ অনুভব করি। মনটা যখন গুনগুন করে গেয়ে ওঠে ‘সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি… , আবেগের অপব্যয় বলে অবহেলা করতে পারিনা তাকে। বরং নিঃশব্দে ডুব দিই বিস্মৃতিচারণায়।
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে নিবিড় ঘনিষ্ঠতার এক রসঘন সচিত্র আলাপন। অতীতের জড়তা মুক্ত সুখপাঠ্য নিবন্ধটি উপহার
দেওয়ার জন্য অশেষ ধন্যবাদ।
আপনার পাঠ-প্রতিক্রিয়াটি লেখকের পরম প্রাপ্তি।