
সুখ কি তাহলে সোনার হরিণ, যার পিছে দৌড়ে মরি? প্রেম কি মিছে? ভালোবাসা কি ছলনা? আমরা কি চাই? কারে চাই? আমরা যাহা চাই ভুল করে চাই, যাহা পাই তাহা চাই না। তাই কি এত অশান্তি? এত হায় হায়, মান অভিমান, চোখের জল?
কবি যাই বলুন, আমরা সাধারন মানুষ, প্রেম ভালোবাসা, মায়া-মোহের বিচিত্র এই ইন্দ্রজাল আমাদের কাছে বড় হয়ে উঠেছে। যদি প্রেম হয় অমৃতকলস/ মোহ তবে রসনার রস’। থাক না মোহ! মোহ ছাড়াও প্রেমে আছে দুঃখ, বিরহও অপ্রাপ্তির আর্তি। তা সত্বেও প্রেম দম্পতিকে ‘সম্মুখপানে চলিতে চালাতে জানে’।
আমরা সুখের আশায় ঘর বাঁধি। আশা দিয়ে ভাষা দিয়ে তাহে ভালোবাসা দিয়ে নিভৃতে যতনে গড়ে তুলি ভালোবাসার ছোট্ট নীড়। আধুনিক কালের পরিবারের নববিন্যাস অনুযায়ী সেই নীড়ে স্বামী স্ত্রী আর সন্তান। সেখানে অন্যদের স্থান সংকুলান হয় না। কেবল অল্পসংখ্যক বাবা-মা ছেলে-বৌমার সংসারে থাকার সুযোগ পায়।

বুড়োবুড়িরা নাকি সুখের অন্তরায়। রায় কার বলা মুশকিল। হয়তো শেষ বয়সে এসে বাবা-মায়েরা অন্তরাত্মার ডাক শুনতে পান। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে তারা কেউ থাকেন বৃদ্ধাশ্রমে, কেউ পথে-ঘাটে, কেউ বা রেলস্টেশনে। সেখান থেকেই তারা ছেলে, বৌমা, নাতি-নাতনীদের শ্রী-সমৃদ্ধি সুখ কামনা করেন। কিন্তু সুখ আসে কই?
মানুষের জীবনে তৃপ্তি নেই, আছে অনন্ত তৃষ্ণা। সুখের খোঁজে মানুষ তাই ছুটে বেড়ায়, খুঁজে বেড়ায় আপন সার্থকতা। কিন্তু সুখ ধরা দেয় না। এ কথা ঠিক, আমাদের এই টানাটানির সংসারে একের প্রতি অন্যের টান বেশি দিন থাকে না। দাম্পত্য প্রেম আগে যতখানি টেকসই ছিল এখন আর ততখানি নেই। এই প্রেমহীনতাই কি সুখহীন নিশিদিন জমাট বাঁধা কান্না হয়ে অন্তরে গুমরে মরে?
“বাঙলা ভাষায় প্রেম অর্থে দুটো শব্দের চল আছে। ভাল লাগা আর ভালোবাসা। ভালাবাসা অর্থে যাহা কিছু ভাল তাহাই সমর্পন করা..অন্যকে মনের সর্বাপেক্ষা ভাল জায়গা স্থাপন করা। ভালো লাগায় ভোগের তৃপ্তি ভালোবাসায় ত্যাগের সাধন।”
‘ত্যাগের সহিত প্রেমের একটি নিগূঢ় সম্পর্ক আছে। ত্যাগ ছড়া প্রেম হয় না। প্রেম না থাকলে ত্যাগ করাও যায় না।’ ত্যাগ করার প্রবনতা আমাদের খুবই কম। সংসারে ত্যাগ সাধারণত নারীই করে থাকে। কারণ নীড় বাঁধার আকাঙ্ক্ষা তার প্রবল। তাই নারীর প্রেমে ত্যাগধর্ম আর সেবাধর্ম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে।

সুখ হলো আনন্দ, প্রশান্তি, ঔদার্য ও প্রফুল্লতার ধারাবাহিক অনুভূতি। বিজ্ঞজনেরা বলেন, সুখ বা আনন্দের বিষয়কে আসলে বাঁধাধরা কয়েকটি বাক্যে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। পৃথিবীতে যত মানুষ, সুখের সংজ্ঞা তাদের কাছে তত রকমের। তত্ত্ব কথায় যাব না। তবে সাংসারিক সুখ দুঃখ নিয়ে কথা বলব।
বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে আমরা সুখী সুখী চেহারার হাসি খুশি দম্পতির ছবি দেখে থাকি। দেখি আর সুন্দর একটা অনুভূতি হয়। আহা! কী সুন্দর যুগলমূর্তি! রূপে রসে হাসিতে খুশিতে ছবিটা তখন স্বর্গীয় মহিমায় উদ্ভাসিত হয়। সুখ যদি না মেলে তবে এই ছবিগুলো কি? সুখের মুহূর্ত? না, মুহূর্তের সুখ?
পরক্ষণেই মনে কৌতূহল জাগে। আচ্ছা এরা তো সব শিক্ষিত উচ্চ-শিক্ষিত স্বামী স্ত্রী। বাস্তবের স্বামী-স্ত্রীর মত এদের মধ্যে কি ঝগড়া হয়? শিক্ষিত স্ত্রী-রা কি ঝগড়া করতে জানে? জানলে, মুখভঙ্গি বা অঙ্গভঙ্গিই বা কেমন হয়? হাতে কি হাতা খুন্তি থাকে নাকি শুধুই মুখনিঃসৃত বাক্যবাণ? স্বামীই বা কি করে তখন? সমানে পাল্লা দেয় নাকি পুরুষের দশ দশা কখনো হাতি কখনো মশা?
সংসার সুখের হয় রমনীর গুনে – প্রবাদের সারবত্তা আজও হারায়নি। কিন্তু অনেক আধুনিকা এসব কথা শুনলে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবেন। বলবেন, মেয়েদের ঘাড়ে দায়িত্ব চাপাবার এ’ এক ফন্দি। পুরুষের কারসাজি। সংসারে সুখ শান্তির দায় নারী একা কেন বইবে? পুরুষকেও সমান দায়িত্ব নিতে হবে। হক কথা। কিন্তু উড়নচণ্ডী পুরুষের সে গুণ কোথায়?
গৃহিণী গৃহমুচ্যতে। যে যাই বলুক সংসারে স্ত্রীলোকের প্রধান্য অস্বীকার করার উপায় নেই। বাঙালি সমাজের গঠন গৃহধর্মে আর সেই গার্হস্থ্য ধর্মের কেন্দ্রভূমিতে নারীর অবস্থান।

আমরা যদি বঙ্গসাহিত্যের দিকে তাকাই তাহলে দেখব সেখানেও স্ত্রীলোকের প্রাধান্য। সে বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্র থেকে শুরু করে করে আজ পর্যন্ত যা কিছু লেখা হয়েছে তাতে নায়িকাই প্রধান। বঙ্কিমচন্দ্র ভালোবাসা নিয়ে যা কিছু লিখেছেন তার অর্ধেকটা জুড়ে নারী। আর শরৎচন্দ্র তো মেয়েদের হয়েই কলম ধরেছিলেন।
পঞ্চভূতের ডায়রীতে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন “বঙ্গ সাহিত্যে পুরুষ মহাদেবের ন্যয় নিশ্চলভাবে ধূলিশয়ান এবং রমনী তাহার বক্ষের উপর জাগ্রত জীবন্তভাবে বিরাজমান।”
বলেছেনঃ “আমাদের দেশের স্ত্রীলোকের পুরুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ…একটা কথা মনে রাখিতে হইবে বঙ্গদেশে পুরুষের কোন কাজ নাই। এ দেশে গার্হস্থ্য ছাড়া আর কিছু নাই, সেই গৃহগঠন এবং গৃহবিচ্ছেদ স্ত্রী লোকেরাই করিয়া থাকে।”
…আমাদের দেশে ভালোমন্দ সমস্ত শক্তি স্ত্রীলোকের হাতে; আমাদের রমনীরা সেই শক্তি চিরকাল চালনা কারিয়া আসিয়াছে। একটি ক্ষুদ্র ছিপছিপে তকতকে স্টিম নৌকা যেমন বৃহৎ বোঝাইভরা গাধা বোটকে স্রোতের অনুকূলে ও প্রতিকূলে টানিয়া লইয়া চলে, তেমনি আমাদের দেশীয় গৃহিনী, লোক-লৌকিকতা, আত্মীয়কুটুম্বিতা পরিপূর্ণ বৃহৎ সংসার এবং স্বামী-নামক একটি চলৎশক্তিরহিত অনাবশ্যক বোঝা পশ্চাতে টানিয়া লইয়া আসিয়াছে….।”
এ পর্যন্ত পড়ে পুরুষদের হয়তো রাগ হতে পারে। না, তিনি ব্যাখ্যাও দিয়েছেন –
“আমাদের দেশে পুরুষেরা গৃহপালিত, মাতৃলালিত, পত্নীচালিত। কোনো বৃহৎ ভাব, বৃহৎকার্য, বৃহৎ ক্ষেত্রের মধ্যে তাহাদের জীবনের বিকাশ হয় নাই, অথচ অধীনতার পীড়ন, দাসত্বের হীনতা-দুর্বলতার লাঞ্ছনা তাহাদিগকে নতশিরে সহ্য করিতে হইয়াছে। তাহাদিগকে পুরুষের কোন কর্তব্য করিতে হয় নাই এবং কাপুরুষের সমস্ত অপমান বহিতে হইয়াছে।”
শুধু কি সাহিত্যে? আমরা যদি টিভি সিরিয়াল দেখি সেখানেও মেয়েরাই সর্বেসর্বা। পুরুষরা সব ঢাকের বাঁয়া। কেবল সঙ্গে থাকে। তারা প্রায় মৌন, কেবল অভিব্যক্তিই সম্বল। মেয়েরা মুখর শুধু নয়, মুখরাও। পর্দাজুড়ে মেয়েদের দাপাদাপি দেখে মনে হয়, মেয়ে তো নয়, যেন আগুনের ফুলকি। তাদের অসাধারণ পটুত্ব প্রেম করায়। সংসার ভাঙা তাদের বাঁ হাতের খেল।
বিভূতিভূষণ বলছেন-“দুঃখের বিষয় আমাদের দেশের মেয়েরা অধিকাংশই অশিক্ষিতা, বিশেষ কিছু জানে না, বোঝে না। – তুচ্ছ বিষয়ে বড় বেশি ঝোঁক, তুচ্ছ কথা নিয়ে দিনরাত আছে। মনে আনন্দ ও স্ফূর্তি কম মেয়েরই আছে। যে ধরণের সদাহাস্যময়ী মেয়ে সংসারে সংসারে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে তাদের সংখ্যা খুবই কম। আমি হাসিখুসি বড় ভালোবাসি, যে মন খুলে হাসতে পারে না, আনন্দ করতে পারে না, তাঁকে নিয়ে সংসারে চলা যায় কি?”
বিভূতিভূষণের কথায় শিক্ষিত হাস্যময়ী নারীরাই সংসারে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে। কিন্তু শিক্ষিত মেয়ে হলেই যে সংসারে সুখ আসবে, এমন কথা বলা যায় না। আমরা শিক্ষিতা মেয়েকেও অশিক্ষিতের মত আচরণ করতে দেখেছি। অন্যদিকে অশিক্ষিতা মেয়েদেরকেও সুষ্ঠুভাবে সংসার সামলাতে দেখেছি। শুধুমাত্র হৃদয়ের রসধারায় আপন সংসারকে শস্যশালী করে তুলেছে এমন মেয়েদেরও আমরা দেখতে পাই।
আর সদাহাস্যময়ী নারী? বিভূতিভূষণ বোধহয় জানতেন না সদাহাস্যময়ী নারীর বিপদ কোথায়। সেকথা বলে গেছেন রবীন্দ্রনাথ -“নারীহাস্যে পৃথিবীতে যতপ্রকার অনর্থপাত করে তাহার মধ্যে বুদ্ধিমানের বুদ্ধিভ্রংশও একটি। রমনী তরলস্বভাববশত অনর্থক হাসে, মাঝের হইতে তাহা দেখিয়া অনেক পুরুষ অনর্থক কাঁদে, অনেক পুরুষ ছন্দ মিলাইতে বসে অনেক পুরুষ গলায় দড়ি দিয়া মরে… প্রবীণ ফিলজফারের মাথায় নবীন ফিলজফি বিকশিত হইয়া উঠে।” মেয়ের হাসির কি জ্বালা – সে মেয়েরাই বোঝে।

শিক্ষিত অশিক্ষিত প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়ল। লেখালেখির হাতেখড়ির সময় একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম কী পড়েছিলাম, আজ আর মনে নেই। সেখানে শিক্ষিতা অশিক্ষিতা মেয়ের তুলনা করতে গিয়ে বলা হয়েছিল – সমমূল্যের কাগজী মুদ্রা আর ধাতব মুদ্রায় যে তফাৎ, শিক্ষিতা আর অশিক্ষিতা মেয়ের মধ্যে সেই তফাৎ। এদের ব্যবহারিক মূল্য একই। সমান সমান।
কাগজের মুদ্রা সঙ্গে নিতে বা বইতে সহজ। ধাতব মুদ্রা ভারী, প্রতিপদে বাজে। ঝন ঝন করে। তবে ধাতব মুদ্রার একটা সুবিধা আছে, ছোট খাট কাজগুলো করানো যায়। কিন্তু কাগজের মুদ্রায় খুচরো কাজ হয় না, ছেঁড়াও যায় না।
সবাই তো সুখী হতে চায় কিন্তু মুশকিল হল, ‘আমার মত সুখী কে আছে’ -কোন মেয়েকেই এমন কথা বলতে শোনা যায় না। সবকিছু পেয়েও তারা অসুখী! এএক ধরনের দুঃখবিলাস। তাদের চোখে অন্য সবাই সুখী, সে নিজে নয়। ও পারেতে সর্বসুখ তাদের বিশ্বাস। যত দামি শাড়িই পরুক অন্যের শাড়ি তার চোখ টানে। পুরুষের যেমন চোখ টানে পরস্ত্রী, নিজের স্ত্রী যত সুন্দরীই হোক। এ এক রহস্য। আসলে কারো কারো কপালে সুখ সয় না।
প্রেমের রহস্য, স্নেহের রহস্য অতি প্রাচীন এবং দুর্গম। নারীর মধ্যেই প্রেয়সী আবার নারীর মধ্যই জননী। নারী তাই রহস্যময়ী। এদের মন বোঝা শক্ত। কিন্তু পুরুষ যখন রহস্যময় হয়ে উঠে নারী তখন কেঁদে কূল পায় না। এরকম উদাহরণও আছে। শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত এমনি এক রহস্যময় পুরুষ। রাজলক্ষ্মী তার মনের তল পায়নি। যখন তাকে মনেপ্রাণে চেয়েছে শ্রীকান্ত কাছে আসেনি। আবার না চাইতেও এসে হাজির।
সম্পর্ক, বিশেষত স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, সেই সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ককে সুখের অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য নির্দেশক বলা যায়। কিন্তু সে সম্পর্কেও জটিলতা আসতে বেশি সময় লাগেনা। কেউ স্ত্রীকে পছন্দ করেন, কিন্তু স্ত্রীর বাড়ির লোকজন তার অপছন্দ। শ্বশুরবাড়ি যেতে চান না। উল্টোদিকে স্ত্রীর স্বামী পছন্দ, কিন্তু স্বামীর বাড়ির লোকজনকে দুচক্ষে দেখতে পারেন না। বাপের বাড়ির দিকে পা বাড়িয়ে থাকেন। ফলে সংসারে শুরু হয় গোলযোগ, শুরু হৃদয়ের রক্তক্ষরণ।

নারী শক্তিময়ী। তবু কেন অবলা বলা হয় কে জানে! নারীর প্রেম পুরুষকে পূর্ণ শক্তিতে জাগ্রত করতে পারে। কারো কারো জীবনে প্রেম হয়ে ওঠে সোনার কাঠি। সেই সোনার কাঠির ছোঁয়ায় প্রেমিক সত্তার উত্তরণ ঘটে এক অপার্থিব লোকে যেখানে প্রেম আপন মহিমায় বিরাজিত। কিন্তু ‘সে প্রেম যদি শুক্লপক্ষের না হয়ে যদি কৃষ্ণপক্ষের হয় তবে তার মালিন্যের তুলনা নেই। ‘
এমন দম্পতিও দেখা যায যেখানে স্ত্রী আপন যোগ্যতায়, বিদ্যাবুদ্ধি ও কৃতিত্বে স্বামীর উপর স্থান পেয়েছে।এরকম ক্ষেত্রে অনেক স্বামী হীনমন্যতায় ভোগে এবং স্ত্রীকে সইতে হয় নানা বিদ্রুপ, বক্রোক্তি, কর্কশ বাক্য। অপরদিকে স্ত্রী যদি স্বামীর যোগ্য না হয় তখন স্ত্রীও ক্লিষ্ট হয় নিজেকে স্বামীর যোগ্য নয় জানার গোপন দৈন্যবোধ আরও নানা আনুষঙ্গিক যন্ত্রণায়।
‘হৃদয় যে একটি প্রেমের পাত্র চায়, সে প্রেমের পাত্র আর কেহ নহে সে নির্দিষ্ট হৃদয়।’ অর্থাৎ যতক্ষণ না আমাদের যথার্থ দোসরকে পাই ,মনের মিল যদি না হয় তখনই গোলযোগ। মনের মিল হলে তবেই মনের মানুষ। কিন্তু মনের মানুষ পাওয়া সহজ নয়। আমি কোথায় পাবো তারে আমার মনের মানুষ যে রে…

হর পূজে বর মিলবে ভালো। আগে দেখতাম কুমারী মেয়েরা শিবপূজো করতো শিবের মত বর পাবে বলে। এখন আর শিবের মত স্বামী তাদের পছন্দ নয়। শিমূল ফুল হলেও তারা চায় ‘হিরো মার্কা’ স্বামী। এখন বরং এয়োস্ত্রীরা নৈবেদ্য সাজিয়ে রাত জেগে পূজো করে স্বামী যেন ভোলেভালা হয়। ঘর গেরস্থালীর সব কাজ করবে। কোন ট্যাঁ ফুঁ করবে না। পান থেকে চুন খসলেই রণং দেহি…স্বামী হবে নিজ গৃহে পরবাসী।
কিন্তু অঘটন ঘটায় বিধি। কথায় বলে অতি বড় ঘরণী না পায় ঘর আর অতি বড় সুন্দরী না পায় বর। যে যারে ধ্যায়ায়, সে তারে পায় না। দেখা যায় পাত্র যেমন ভজহরি, তেমনি কন্যা বিদ্যাধরী – তখন অরাঁধুনীর হাতে পড়ে রুই মাছ কাঁদে/ না জানি রাঁধুনী মোরে কেমন করে রাঁধে। সংসারে তাল কাটে। আবার কখনো দেখা যায় যেমন হাঁড়ি, তেমন সরা। একেবারে রাজযোটক মিল। তখন স্ত্রীর কাছে পুরুষবন্দী, জালে বন্দী মাছ। স্ত্রী হয়ে ওঠেন রত্ন। স্ত্রীরত্ন, ঘরের লক্ষ্মী।
সেই রত্ন ঘরে আসে পুরুষের জীবনের এক উদ্দাম মুহূর্তে। স্ত্রী হন জপের মালা। কাজল আঁকা চোখের উপর নিমেষ হারা চোখে তাকিয়ে থাকা….রক্তিম সলজ্জ আনত মুখের কি মহিমা…’লাখ লাখ যুগ হিয়ে হিয়ে রাখলুঁ তবু হিয়া জুড়ন না গেল’..তখন শুধু তুমি আর আমি, ভেসে এসেছি যুগল প্রেমের স্রোতে।… ‘কেবল আঁখি দিয়ে আঁখির সুধা পিয়ে হৃদয় দিয়ে হৃদি অনুভব–/ আঁধারে মিশে গেছে আর সব।’

দুজন থেকে তিন জন হয়। চার জন হয়। তখন আর অন্ধকারে মুখোমুখি বসে থাকার ফুরসৎ হয় না। বাস্তবের ময়দানে কঠিন লড়াইয়ে নামতে হয়। তার সঙ্গে যে জড়িয়ে আছে বিচিত্র কর্তব্য ও দায়িত্ব! অর্থের সংস্থান। সন্তানের লেখাপড়া। স্কুল। টিউশন। বাজার-হাট, দোকান… দুয়ারে ফ্লিপকার্ট-আমাজন… বিলাসদ্রব্যের উপকর…সকলের বিল মেটাতে হয় …বউয়ের মুখের হাসি ধরে রাখতে হয়।পু রুষের সে এক করুণ অবস্থা।
তবু থাকে অভাব-অভিযোগ। শূন্যতার আর ব্যর্থতার কত ফাঁকফোকর। বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও অনুভবের রূপ চেতনায় আঁকা হতে থাকে। অন্তরে প্রদীপ জ্বলে। ঝড়ও বয়। উদ্দাম মুহূর্তের সেই লক্ষ যুগের হিয়া অলক্ষ্যে কখন যে ঠান্ডা হয়ে যায়, কেউ তার খবর রাখে না।

মেয়েরা কিছুটা pratical, ‘সে যা পেয়েছে তার মধ্যেই তার আকাঙ্ক্ষার অবসান।’ মেয়েরা আপন পূর্ণতা অধিক অনুভব করে (এইজন্য তারা যাকে-তাকে ভালোবেসে সন্তুষ্ট থাকতে পার) পুরুষরা আপনার অপূর্ণতা অধিক অনুভব করে, এইজন্য জ্ঞান বল, প্রেম বল, কিছুতেই তাদের অসন্তোষ ঘোচে না।’ জীবন নিয়ে মেয়েদের কিন্তু নগদ কারবার। নিক্তি ওজনে ভালোবাসা মাপে। এক কানাকড়ি ছাড়তে চায় না। ফেলো কড়ি মাখো তেল….ভালোবাসা কম হলেই গন্ডগোল।
চেতনেতে অচেতন, পিরীতে যার টানে মন। সংসারে কিছু চঞ্চল স্বভাবের পুরুষ থাকে যারা মাঝে মাঝেই বেসুরো হয়। এদের বাগে আনা নারীর পক্ষে কঠিন কাজ। তাই নিয়ে সংসারে নিত্য কুরুক্ষেত্র, নিত্য রাবণ বধ। কিন্তু চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনী। নারীকে করতে হয় কত লীলার ছল। নারী বুঝে যায, শুধু কাজল পরলেই হবে না, চাউনি চাই..আমি রূপে তোমায় ভোলাব না, ভালোবাসায় ভোলাব। কিন্তু ভবি ভোলে কই? দাম্পত্য জীবনে তৃতীয় ব্যক্তির প্রাদুর্ভাব কী নারী কী পুরুষ কেউই সহ্য করতে পারে না। আনে অনিবার্য সংঘাত।
রমনীর ‘দোষ আছে, গুণ আছে, পাপ আছে পুণ্য আছে, কত দৈন্য আছে…কিন্তু আছে অক্ষয় এক রমনীহৃদয়।’
সংসারে এমন কিছু পুরুষ থাকে অশান্তি না করলে তাদের ভাত হজম হয় না। এরা হৃদয়টাকে না দেখে বড় করে দেখে শুধু দৈন্যটাকে। পরে নিন্দে নাহি দেখে ছিদ্র আপনার। এরা সংসারে কুটোটি নাড়ে না। অথচ খুঁজে খুঁজে বের করে স্ত্রীর ত্রুটি- অসম্পূর্ণতা। তা নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, কটাক্ষ করতেও ছাড়ে না। সেটা যে মেয়েদের একেবারে মর্মমূলে আঘাত করে, সে জ্ঞান তাদের লোপ পেয়ে যায়।
যে দেয় অন্তরে ব্যথা তার সঙ্গে কিসের কথা। সংসার তখন সাইলেন্ট মোডে চলে যায়।
‘দুই জন পাশাপাশি যবে / রহে একা, তার চেয়ে একা কিছু নাই এ ভুবনে। …বসন্তের রসরাশি সেও হয় দারুণ দুর্বহ / যুগলের নিঃসঙ্গতা নিষ্ঠুর বিরহ।’ ..দুটি পাখি দুটি তীরে মাঝে নদী বহে ধীরে….সে এক কঠিন পরিস্থিতি।
বন পুড়লে সবাই দেখে, মন পুড়লে কেউ না দেখে। বুদ্ধিমান পুরুষেরা এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে সহজেই। তারা জানে, সাধনেই সিদ্ধি। সাধলেই সিদ্ধি। ‘সখা সাধিতে সাধাতে কত সুখ / অভিমান আঁখিজল নয়ন ছলছল -/ মুছাতে লাগে ভালো কত / তাহা বুঝিলেনা তুমি মনে রয়ে গেল দুখ।’
কিন্তু সাধলেই যে সিদ্ধিলাভ হবে এমন কথা বলা যায় না। অনেক কড়া ধাতের স্বাধীনচেতা, স্বাধিকারপ্রমত্তা স্পষ্টবক্তা মেয়ে আছে, যারা স্তুতিবাক্যে ভোলে না। সরাসরি পুরুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বলে তার হাতে পড়ে তার হাড়মাস কলি হোল। জীবনটা বরবাদ হয়ে গেল। আমি মুক্তি চাই। রগচটা পুরুষের পৌরুষে আঘাত লাগে। হিতাহিত জ্ঞান হারায়। কথায় কথা বাড়ে। কথার হাত পা বেরোয়। সংসারে আগুন লাগে।
কত পুরুষ বলতে শোনা যায়, নাঃ, সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল । ওর সঙ্গে আর একদন্ড থাকতে পারব না। সংসারে দমবন্ধ হয়ে আসছে। যে হতে পারত সহচরী, সে হয়ে উঠেছে কারাপ্রহরী। সহানুভূতির স্থান নেয় তিক্ত বিদ্বেষ। দুজনের মধ্যে মানসিক আশ্রয়ের পরিবর্তে গড়ে ওঠে দুর্ভেদ্য প্রাচীর।
কেউ কেউ বলেন দাম্পত্য কলহ সংসারের পক্ষে স্বাস্থ্যকর। দাম্পত্যের ভিত্তিভূমি যদি প্রেম হয়, তাহলে কলহ শেষ পর্যন্ত মধরেণ সমাপয়েৎ হয় – একথা ঠিক। কিন্ত বহু বিকৃতিতে, স্বার্থসংকীর্ণ, অহমিকানিষ্ঠ স্বামী-স্ত্রীর সংঘাতে জীবন থেকে প্রেম কখন যে অন্তর্হিত হয়ে যায়, পড়ে থাকে শুধু বন্ধনটি। স্বামী স্ত্রীর মনের খবর রাখেন না। স্ত্রী স্বামীর জগতে ঢুকতেও চান না। কোন গুরুত্বও দেন না। ফলে দুজনেই তখন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা।
স্ত্রীবুদ্ধি প্রলয়ঙ্করী – আজকের দিনে এ কথাটা আর খাটে না। স্ত্রীর চাইতে বড় বন্ধু আর কে? বিপদে আপদে তিনিই রক্ষাকর্তী, পরামর্শ দাত্রী। আমাদের মহাকবি স্ত্রীকে শুধু গৃহিনী বলেই ক্ষান্ত হননি, বলেছেন সচিব – গৃহিণী সচিবঃ সখী মিতঃ । পুরুষ অনেক সময় অবিবেচকের মত কাজ করে; পত্নীরূপিনী মুখ্য সচিব যদি রক্ষা না করেন ,মুর্খ পুরুষকে তবে কে রক্ষা করবে?

দিন ‘বদলেছে। নারী আজ আর গৃহস্থালির ক্ষুদ্র গন্ডীতে আটকে নেই। তাকে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরোতে হয়। চাকরি করতে হয়। আর পাঁচ জনের সঙ্গে মিশতে হয়। স্কুল কলেজ, অফিস আদালত থেকে শুরু করে এমন কোন কর্মক্ষেত্র নেই যেখানে মেয়েদের পা পড়েনি। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়াতেও তার দাপট অব্যাহত। সভা-সমিতি, রাজনীতির ক্ষেত্রেও সে আজ পুরুষের সঙ্গে সমান তালে পা ফেলে এগিয়ে চলেছে। নদী হয়ে উঠছে মহানদী।
কিন্তু মানুষের জীবনের গভীরেই ট্র্যাজেডির বীজ লুকিয়ে থাকে। যেখানে শান্তি বিরাজমান, সেখানে কোন্ এক অভিশাপে সংসারের শান্তি ভেঙে চুরমার করে দেয়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ, সংশয়, অপমান, জ্বালা জীবনকে করে তোলে বিপর্যস্ত, জাগায় অভিমান। অভিমান থেকে জেদ। সেই জেদ জীবনকে নিয়ে যায় অনেক দুরে। দিকহারা দুজন তখন আর সংসার করতে পারে না। আসে বিচ্ছেদ। কখনো কখনো দুজনেই, কখনো বা দুজনের একজন তখন পরিত্রাণ পাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে।
কিন্তু সাত পাকের বিয়ে চৌদ্দ পাকেও খোলে না। মামলা মোকদ্দমা কত অর্থ খরচের পর আইনের ফাঁস আলগা হয়। তারা মুক্তি পায়। কিন্তু অন্য ধরণের ফাঁস আটকে যায় সন্তানের গলায়। অসহায়তার, নিরাপত্তাহীনতার। সে দাগ আর উঠে না। দমবন্ধ অবস্থা হয় সন্তানদের। বাবা মা’র সম্পর্কের টানাপোড়েনের মাশুল গুনতে হয় তাদের জীবনভর।
শেষ বয়সে এসে মানুষ হিসাব মেলাতে বসে। কী দিলাম আর কী-ই বা পেলাম। স্বপ্ন ছিল ছেলে মেয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হোক, মানুষ হোক। কারো স্বপ্ন সফল হয়েছে। কারো বা হয়েছে স্বপনভঙ্গ। সে তখন ভয়ঙ্কর একা। ছেলে বিদেশে। মেয়ে অনেক দুরে। নাতি নাতনীদের সঙ্গে অনিবার্য ভাষাগত দূরত্ব। এখন নিজেকে নিঃসঙ্গ বিহঙ্গের মত মনে হয়। মনে হয় এই কি চেয়েছিলাম? ছেলে প্রতিষ্ঠিত হল, মানুষ হল কই?
ঝরে পড়ে আক্ষেপের সুর “-হায়রে হৃদয়/তোমার সঞ্চয়/ দিনান্তে নিশান্তে শুধু ফেলে যেতে হয়।”

তাহলে কীভাবে আমরা সুখী হব? সত্যিকারের সুখ কোথায়? নাঃ, সুখ চেয়ে আর কাজ নেই। বলি,’সুখ সুখ করে কেঁদো না আর / যতই কাঁদিবে যতই ভাবিবে ততই বাড়িবে হৃদয় ভার।’ তার চেয়ে বরং রবীন্দ্রনাথের কাছে আবার যাওয়া যাক । দেখি, উত্তর-টুত্তর কিছু পাই কী না —
“সুখ শুধু পাওয়া যায় সুখ না চাইলে,/ প্রেম দিলে প্রেমে পুরে প্রাণ,/ নিশিদিন আপনার ক্রন্দন গাহিলে ক্রন্দনের নাহি অবসান।”