
সম্প্রতি পণ্ডিচেরি গিয়েছিলাম। বছর শেষের ছুটির আমেজে কলকাতার বাইরে গিয়ে কদিন কাটিয়ে আসার ইচ্ছে তো ছিলই। তাছাড়াও ছিল আমার সতেরো বছর বয়সে দেখা সমুদ্রতীরবর্তী শহরটিতে আরেকবার ফেরার আকাঙ্ক্ষা।

ফরাসি উপনিবেশ হিসেবে পণ্ডিচেরি শহরের স্থাপন হয়েছিল ১৬৭৩ সালে । কিন্তু বাঙালিদের সঙ্গে এখানকার বিশেষ যোগসূত্রের কারণ নিশ্চয়ই শ্রী অরবিন্দ ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত আশ্রম । অগ্নিযুগের তেজোদ্দীপ্ত সময়ে সশস্ত্র বিপ্লবের পথ পরিহার করে আধ্যাত্মিক সাধনার জগতে চলে এসেছিলেন অরবিন্দ। তাঁর এই সিদ্ধান্ত নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। আবার অনেকের কাছেই তাঁর জীবনের এই গতিপরিবর্তন গভীর তাৎপর্যময়। তবে একথা ঠিক যে অরবিন্দের উচ্চাঙ্গের আধ্যাত্মিক চিন্তা সাধারণের কাছে খুব সহজবোধ্য নয়।

১৯৯০ সালে আমরা সদলবলে এসেছিলাম পুজোর ছুটিতে, নিছক ভ্রমণার্থী হিসেবেই। ছিলাম সপ্তাহখানেক, কারণ তখন জীবনে অবকাশ এত দুর্লভ হয়নি । সেবার আমরা এসে পৌঁছই ২রা অক্টোবর । শরতের নিবিড় নীল আকাশে ছিল চন্দনের প্রলেপের মতো সাদা মেঘ, পথের ধারে বিশাল গান্ধীমূর্তিতে জন্মদিনে মালা পরানো। আলোয় ধোয়া নির্মল শান্ত শহর, ফাঁকা পথঘাটে বড় বড় গাছের ছায়া । টুকরো ছবির মতো মনে আছে দৃশ্যগুলি। সাহেব পাড়ার অন্তর্গত একটি সাধারণ, ছিমছাম অতিথিনিবাসে আমরা ছিলাম । রাস্তার নাম Rue Suffren, ভালো লেগেছিল নামটা। বাবার কলেজের এক অধ্যাপক সেখানে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন । তিনি প্রায়ই পণ্ডিচেরি আসতেন, তাঁর মামা শচীন চট্টোপাধ্যায় এখানকার প্রবীণ আশ্রমিক। শচীনবাবুর বয়স তখন পঁচাত্তরের কাছাকাছি, কিন্তু হাঁটাচলা সহজ, সাবলীল । আশ্রমের অনেক দর্শনীয় জায়গা, বাড়িঘর তিনি স্বেচ্ছায়, সাগ্রহে আমাদের দেখিয়েছিলেন । মনে পড়ে, ঠিক তার আগের বছর (১৯৮৯) প্রয়াত হয়েছেন বিখ্যাত গায়িকা, রবীন্দ্রনাথ ও অরবিন্দের স্নেহধন্য সাহানা দেবী। তিনি যে কুটিরে থাকতেন তাকে ঘিরে ছিল একটি বিশাল বকুলগাছ। সেই বাড়িটি শচীনবাবুর সৌজন্যে আমাদের দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল।

এবারের আসা সব দিক দিয়েই আলাদা । আমরা তিনজন এসেছি কলকাতা থেকে বিমানযোগে, হাতে সময় মাত্র তিন চারদিন । এই দ্রুতগামিতার যুগেও পণ্ডিচেরি পৌঁছনো খুব সহজসাধ্য নয় । চেন্নাই থেকে গাড়িতে তিন ঘণ্টার পথ, অচেনা অন্ধকার রাস্তা দিয়ে পৌঁছতে রাত সাড়ে নটা বাজল । আমাদের হোটেলটি একনজরে বেশ সুন্দর, আশ্রম থেকে দূরে নয় কিন্তু তার সীমানার বাইরে ।
অতীত অনেকটা দুরন্ত বালকের মতো, আড়ালে গেলেই সরে যায় অনেক দূরে । পণ্ডিচেরির সেকালের নিস্তব্ধ পরিবেশও যথেষ্ট ক্ষুণ্ণ হয়েছে, পরের দিন সকালে বেরিয়েই চোখে পড়ল রাস্তাঘাট লোকজনের যাতায়াত ও যানবাহনের কোলাহলে মুখর । আশ্রমের পথে পর্যটকদের মেলা । ফরাসি আমলের সেই সাদা রঙের বাড়িগুলি অতীতের স্মৃতি নিয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে । নানারকম বিধিনিষেধের ফলে আশ্রমের পরিধিকে যেন কিছুটা সংকীর্ণ করে দেওয়া হয়েছে । প্রবেশপথের ভিতরে অতি মনোরম বাগান, শীতের রঙিন ফুলের অপরূপ সমারোহ । কিন্তু কোনও কথা বলার অনুমতি নেই । অরবিন্দের সমাধিস্থলে বেদীর আশেপাশে অনেকে ধ্যানস্থ হয়ে আছেন । আগের বারে আমরা দোতলায় গিয়ে আশ্রম প্রতিষ্ঠাতার বসার ঘরটি দেখেছিলাম, এখন সেই অংশ আর সাধারণের কাছে উন্মুক্ত নয়।
বারান্দা পেরিয়ে আশ্রমের প্রকাশনালয়। অরবিন্দ ও শ্রীমায়ের রচিত এবং তাঁদের নিয়ে লেখা বইপত্র, ছবি ও কার্ড কেনার ব্যবস্থা সেখানে। আমরা দু একটি বই কিনলাম। এর আগের বারেও কেনা হয়েছিল, তার কয়েকটির নাম মনে আছে। সেই বয়সে সে সব লেখার মর্ম গ্রহণের সাধ্য ছিল না। অরবিন্দের লেখা On Himself নামে একটি বই, শিষ্য নীরদবরণের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন নিয়ে আর একটি। হয়তো বাড়িতে খুঁজলে এখনও পাওয়া যাবে।

আশ্রমের সামনের ফুটপাথের উপরে একটি নিমগাছ – মনে হল গাছটি সেকালেও ছিল, তাই কত চেনা । আর একটু গেলেই dining hall – সে সময়ে সকলে এখানেই আসতাম প্রতিদিন, খাওয়াদাওয়া সারতে। দুপুরে ও রাতে অতি অনাড়ম্বর নিরামিষ খাদ্য, সকালে সাহেবি breakfast । ঘড়ির কাঁটার মতো নিয়মে চলত সব কিছু, হয়তো এখনো চলে । এই নিয়ে একটি মজার গল্প মনে পড়ল । একবার আশ্রমের খাওয়া নিয়ে কিছু বিতর্ক অশান্তির সৃষ্টি হয়, তখন অরবিন্দ সবার জন্য এই সাদাসিধে খাবারের ব্যবস্থা করে বলেছিলেন “Now that the food is equally unpalatable to all , I hope everyone is satisfied.”

সেদিনের দ্বিতীয় গন্তব্য Auroville । ১৯৭০ সালে এর পরিকল্পনা করেছিলেন শ্রীমা; তিনি চেয়েছিলেন পৃথিবীর সকল সম্প্রদায়ের বাসস্থান হয়ে উঠুক জায়গাটি, একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক গ্রামের মতো। বহু মানুষের আনাগোনা এখানে, কিন্তু আদর্শের সেই মহিমা বাস্তবে অনেকটাই ম্লান মনে হল। ছোটো ছোটো boutique এ অতি মহার্ঘ হস্তশিল্পের নিদর্শন। পণ্ডিচেরিতে আগেও ছোটোখাটো শৌখিন জিনিসপত্র বেশ দামী ছিল।

পরের দিন শহরের museum এ ঘন্টাখানেক সময় কাটিয়ে সোজা সমুদ্র দর্শনে। Museum এ মূলতঃ চোল রাজত্বকালের পুরোনো নিদর্শন – দৈনন্দিন ব্যবহারের প্রাচীন বস্তু, নটরাজ ও অন্যান্য দেব দেবীর মূর্তি। আমার museum পছন্দ নয় কোনোকালে, সেখান থেকে সমুদ্রের খোলা হাওয়ায় নিঃশ্বাস নিয়ে বাঁচলাম। ডিসেম্বরের শেষ, কিন্তু ঠাণ্ডা নেই এতটুকু। তরঙ্গিত নীল সিন্ধুজলের তীরে বাতাসের প্রবল মাতামাতি । Serenity beach এর মুখোমুখি লোকালয়ে সার দেওয়া বাড়িগুলি চমৎকার, বুগেনভিলিয়ার লতায় ছায়াচ্ছন্ন। ফেরার পথে দিলীপকুমার রায়ের বাড়ি, Rue St Louis তে । দৈব প্রতিভাসম্পন্ন এই সুর সাধকের গানে ছিল অপার্থিবের আবেশ। সুসাহিত্যিক ও অসামান্য পণ্ডিতও ছিলেন তিনি, এবং অরবিন্দের প্রিয় শিষ্য । আগের বারেও তাঁর বাড়িটি দেখেছিলাম, অনেক দিন হল এটি Tresor Nursing Home নামে একটি চিকিৎসালয়ে পরিণত হয়েছে, দিলীপকুমারের বসবাসের আর কোনো চিহ্ন নেই সেখানে।

বেলা চারটের ঘন ছায়া এসে পড়েছে সেই বাড়ির সিঁড়িতে, গাছপালায় ঘেরা উঠোনে । সেদিনের মতো হোটেলে ফিরছি যখন, নিরিবিলি রাস্তার ধারে Baskin Robbins এর দোকানের জানালায় দিনের শেষ আলোর আভা। আগের বারে যে বাড়িতে ছিলাম – সেটা দেখা হল না, এখন আর খোঁজার সময় নেই । এবারের ভ্রমণে ওইটুকু অসম্পূর্ণতা থেকে গেল । কারণ আমি যাকে দেখার জন্য এসেছি সে তো কেবল একটি আশ্রম শহর বা আমার প্রিয় গায়ক দিলীপ কুমার রায়ের বাসভূমি নয়, আমি মনে মনে খুঁজছি সাড়ে তিন দশক আগে হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর একটি প্রান্তকে ।
কিন্তু ২৯ শে ডিসেম্বর পণ্ডিচেরি থেকে ফিরে আসার দিন সকালে আমাদের driver ঠিকানা জেনে সে বাড়ির সামনে কিছুক্ষণ গাড়ি থামালেন । রাস্তার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে আমি দেখছি সেই “সমর্পণ” নামের অতিথি নিবাসকে – যার সঙ্গে আজ আমার ৩৪ বছরের ব্যবধান । মনে হল, কত সহজ সরল, পরিমিত ছিল তখন আমাদের জীবন – যেমন সহজ সুন্দর এই বাড়িটি।