
পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের প্রদেশ হবার পরে
বাঙলা ভাষার দাবি ওঠে সেই একই বৎসরে।
কী ভাবে হয়েছিল বাংলাভাষার অধিকার হরণ —
আগেই আমরা দিয়েছি তার কিছু কিছু বিবরণ।
উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাজভাষা —
এই ঘোষণায় বাঙালিদের বাড়ছিল হতাশা।।
বাংলাই হবে রাষ্ট্রভাষা — পাক সরকারের উদ্দেশে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র সমাবেশে
এই দাবি তোলা হয় আর একে করেন সমর্থন
শহিদুল্লাহ, মনসুর আহমেদ প্রমুখ বিদ্বজ্জন।।
রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের হয় এরপর স্থাপনা–
গণপ্রতিনিধিরাও ছড়িয়ে দেন এই ভাষা-চেতনা।।
বাংলার অধিকারহরণ আর উর্দুর আধিপত্য–
এর প্রতিবাদ করেন সাংসদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।
তেরো শো চুয়ান্ন সনে বসে করাচিতে যখন
পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন,
সেখানেই হয় বাংলার জন্য দাবি তোলা শুরু।
ধীরেন্দ্রনাথ কন, রাষ্ট্রে বাংলাভাষীই সংখ্যাগুরু,
সে কারণে রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত বাংলার
এই দাবিতে তিনিই প্রথম হয়েছিলেন সোচ্চার।।

এই প্রস্তাবে হয়নি রাজি মুসলিম লীগ সরকার,
প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী নিন্দা করেন তার।।
পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী খ্বাজা নাজিমউদ্দীন কন:-
রাষ্ট্রভাষা হিসাবে শুধু উর্দুই চায় পাক জনগণ।।
ধীরেন্দ্রর ওই মুলতুবি প্রস্তাব হয় শেষে অগ্রাহ্য
অধিকাংশ সদস্যের বাধায়, কিন্তু এহ বাহ্য।।
এইভাবে যে আন্দোলনের হয়েছিল আরম্ভ,
দমাতে পারেনি তাকে পাক শাসকদের দম্ভ।।
[ধুয়া — “আগে কহ আর আহা আগে কহ আর!”]
সভা, মিছিল আর ধর্মঘটে পূব বাংলা হয় উত্তাল
লিখেছিল নূতন এক ইতিহাস সেই দ্রোহকাল।।
সেই দ্রোহেরই প্রকাশ ছিল একুশের সেই ঘটনা,
ইতিপূর্বেই সবিস্তারে আমরা করেছি তার বর্ণনা।।
চার কোটি বাঙালি চায় মাতৃভাষার অধিকার,
পরে আমরা দেখব কী বা পরিণতি হয় তার।।
ষাট সনে আসন্ন হলে প্রাদেশিক নির্বাচন
পূর্ববঙ্গে হয়েছিল যে পট পরিবর্তন,
ফিরে যাব আমরা এবার তাহার কাহিনীতে।
চারটি রাজনৈতিক দল মিলে সহমতের ভিত্তিতে
গড়ে তোলে এক রাজনৈতিক জোট যুক্তফ্রন্ট নামে
মুসলিম লীগকে উৎখাত করতে নির্বাচন-সংগ্রামে।।
আওয়ামী মুসলিম লীগ ছাড়া জোটের আর তিন দলের নাম —
কৃষক-শ্রমিক পার্টি, গণতান্ত্রিক দল আর নিজাম -এ-ইসলাম।।
তিনজন জনপ্রিয় নেতা ছিলেন এই জোটের নায়ক —
মওলানা ভাসানী, সোহরাবর্দি আর এ কে ফজলুল হক।
সাধারণ মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণ করিবারে
চোদ্দ দফা দাবি ছিল এই জোটের নির্বাচনী ইস্তাহারে।।
প্রথমেই বলা হয়েছিল এতে না রেখে ধোঁয়াশা–
বাংলাই হবে পূর্ব বাঙলার মান্য রাষ্ট্রভাষা।।
মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের দূর হবে সব বাধা,
একুশে ফেব্রুয়ারির থাকবে বিশেষ মর্যাদা
শহীদ দিবস রূপে, ছুটির দিনও হবে আর
ভাষা-শহীদদের স্মৃতিতে গড়া হবে মিনার।।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও শিল্পের নানাবিধ সংস্কার,
পূর্ববাংলার প্রাদেশিক স্বায়ত্ত শাসনের অধিকার,
পাট ব্যবসার জাতীয়করণ আর জমিদারির অবসান
দুর্নীতি রোধ, রাজবন্দীমুক্তি আর কর্মসংস্থান,
শাসন-ব্যয় হ্রাস, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অধিকার —
এসব দাবিও তুলে ধরেছিল চোদ্দ দফা ইশতেহার।।
একুশে ফেব্রুয়ারির আগেই মুসলিম লীগ সরকার
যুক্তফ্রন্টের নেতা কর্মীদের করে নেয় গ্রেফতার।।
শহীদ দিবস জাগাতে পারে জাতীয়তার প্রেরণা,
গ্রেফতারের উদ্দেশ্য ছিল রোধ করা তেমন সম্ভাবনা।।
বাংলাবিরোধী মুসলিম লীগের এই নীতির কারণ
অচিরেই ঘটে যায় রাজনীতির এক পট পরিবর্তন।।

নির্বাচনে মুসলিম লীগের ঘটে বিরাট পরাজয়,
ফলে পূর্ববাংলায় যুক্তফ্রন্টের সরকার গঠন হয়।।
আওয়ামী লীগ পায় যদিও সর্বাধিকসংখ্যক আসন —
কেন্দ্রের ইচ্ছায় ফজলুল হক সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হন।।
আরো কয়জন সদস্য ছিলেন হক-মন্ত্রিসভার —
আজিজুল হক, আশরাফউদ্দিন ও আবুহোসেন সরকার।।
মন্ত্রিসভায় যোগ দেন পরে আতাউর রহমান খান,
কনিষ্ঠ এক মন্ত্রী ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান।
[ধুয়া:- “আগে কহ আর, শুনি আগে কহ আর!”]


যুক্তফ্রন্ট সরকারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘোষণা –
বাংলা ভাষার উন্নয়নে একটি অ্যাকাডেমির স্থাপনা।।
করাচিতে মুসলিম লীগের এক সংসদীয় সভায়
রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলাও স্বীকৃতি পেয়ে যায়।।
তেরো শত একষট্টি সনটি স্মরণীয়, কারণ
গণপরিষদে বাংলার দাবি করা হয় গ্রহণ।।
উর্দুর সঙ্গে বাংলারও একটি রাষ্ট্রভাষা হবার
প্রস্তাব উঠলে পায়নি তা অবশ্য সমর্থন সবার।।
কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠদের সমর্থনের দৌলতে
এ প্রস্তাব পাস হয়ে যায় শেষে গণপরিষদে।।
বাংলা সহস্র বাঙালির আত্মত্যাগের ফলে
মান্যতা লাভ করে অবশেষে রাষ্ট্রভাষা বলে।।
বাংলা ভাষা পেল বটে যোগ্য আসন তার,
কিন্তু টিঁকতে পারল না এই যুক্তফ্রন্ট সরকার।।
পূর্ববঙ্গের মানুষের জন্য পূর্ণ স্বায়ত্ব শাসন
কায়েম করার দাবি এই সরকার তুলেছিল যখন,
তখনই প্রমাদ গুনেছিল পশ্চিমা প্রভুর দল,
বাংলার দখল হারাবার ভয়ে হয়েছিল চঞ্চল।।
সেই সময়ে কলকাতায় এসে ফজলুল হক একবার
বলেছিলেন আত্মিক ঐক্যের কথা দুই বাংলার।।
ভালোভাবে নেয়নি তখন পাকিস্তান সরকার একে,
হক উৎখাতের ষড়যন্ত্রের শুরু হয় সেই থেকে।।
ভারতের কাছে দেশ বিকানোর অভিযোগ তোলা হয়,
হক সাহেবের কলকাতা ভাষণ কারণ এর নিশ্চয়।।
ফ্রন্ট সরকারের শরিকদের মধ্যেও বিভেদ সৃষ্টি করে
বিবাদের বীজ ছড়ানো হয় ওই ফ্রন্টের ভিতরে।।
কেন্দ্রের মুসলিম লীগ সরকারের প্ররোচনার ফলে
বাঙালি-অবাঙালি দাঙ্গা লাগে এক পাটকলে।।
দাঙ্গায় মৃত বাঙালির সংখ্যা পাঁচশোর কম নয়,
ফ্রন্ট সরকারের ওপরেই এর দায় চাপানো হয়।।
যতই জনপ্রিয় হোক না যুক্তফ্রন্ট সরকার,
অভিযোগ ওঠে বিচ্ছিন্নতা ও অব্যবস্থার।।
পূর্ববঙ্গে পাঠানো হয় এরপর নূতন গভর্নর
ইস্কান্দার মির্জা নামে এক মুসলিম লিগপন্থী কট্টর।।
দুই মাস পূর্ণ হবার আগেই সরকার প্রতিষ্ঠার
গভর্নর জেনারেল বরখাস্ত করেন যুক্তফ্রন্ট সরকার।।
পূর্ব বাংলায় জারি করা হয় গভর্নরের শাসন,
গ্রেফতার হলেন যুক্তফ্রন্টের নেতা ও কর্মীগণ।।
দমনপীড়ন চলল অবাধ এই সরকারকে ফেলে,
ফজলুল হক হলেন গৃহবন্দী, শেখ মুজিব যান জেলে।।
কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হয়, হাজার লোক গ্রেফতার —
সন্ত্রাসের রাজ কায়েম করেন মির্জা ইস্কান্দার।।
[ধুয়া :- “ধিক ধিক ধিক! ওরে ধিক শত ধিক!”]
পরের কয় মাসের ঘটনাবলীও কম বিস্ময়কর নয়,
সোহরাবর্দী ও হককে কেন্দ্রের মন্ত্রী করা হয়।।
পূর্ববঙ্গের জন্য হকসাহেবের প্রয়াস চলে এইবার —
আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে গড়ার নিজ দলের সরকার।।
এর ফলে দুই দলের মধ্যে শুরু হয় বিভাজন —
এই পথেই সম্পূর্ণতা পায় যুক্তফ্রন্টের ভাঙন।।
কেন্দ্রের মুসলিম লীগ সরকারের সুচতুর কৌশলে
নানা রকম ভাঙচুর চলে আরো নানা দলে।।
যুক্তফ্রন্টের দলগুলি দুই জোটে হয় বিভক্ত,
আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক ভাবধারার অনুরক্ত।।
রক্ষণশীল নীতি ফজলুল হকের জোটটির অপরদিকে,
তাঁর লক্ষ্য মুসলিম লীগকে তোয়াজ করে থাকা টিঁকে।।
রাজনীতির এই খেলায় কেন্দ্র বছরখানেক পরে
গভর্নর-শাসন তুলে বঙ্গে নূতন এক সরকার গড়ে ।।
প্রত্যাশিতভাবেই সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হন এবার
কৃষক শ্রমিক পার্টির নেতা আবু হোসেন সরকার।।
এই সরকারের আমলের কিছু উল্লেখ্য ঘটনা —
একুশেকে শহীদ দিবস ও ছুটির দিন ঘোষণা।।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ভিত্তিও হয় স্থাপন,
যে প্রস্তাব আগেকার সরকার করেছিল গ্রহণ,
শেষে এই সরকারের আমলে হল তার রূপায়ন —
ঢাকাতে সম্পূর্ণ হয় বাংলা একাডেমির স্থাপন।।


প্রদেশের নাম বদলাতে আসে কেন্দ্রের ফরমান —
পূর্ববঙ্গের স্থলে এর নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান।।
ফজলুল হক ও মুসলিম লীগের প্রচ্ছন্ন সমঝোতায়
গভর্নর হয়ে এরপর তিনি আসিলেন ঢাকায়।।
সেখানে ক্ষমতায় তখন তাঁর দলেরই সরকার,
তাকে টিঁকিয়ে রাখাই হল প্রধান লক্ষ্য তাঁর।।
বাজেট পাশ করতে আবু হোসেন সরকার ব্যর্থ হলে
কেন্দ্রের শাসন জারি করা হয় বিশেষ ক্ষমতাবলে।।
সাত দিন পরে ফেরানো হয় আবার সেই সরকার।
গণতন্ত্রের এই অদ্ভুত প্রহসন ঘটে বারংবার।।
সংসদীয় রীতি মেনে গড়তে পরবর্তী সরকার,
পায় নাকো ডাক আওয়ামী লীগ, এমনি অবিচার।।
গণপরিষদে পেশ হয় যখন খসড়া সংবিধান,
হকের দল এই প্রস্তাবে করে সমর্থন প্রদান।।
খসড়ায় বলা হয়েছিল – চালু হলে এই সংবিধান —
এক ইসলামিক প্রজাতন্ত্র হবে পাকিস্তান।।
এটাতে আপত্তি ছিল আওয়ামী লীগের,
তাদের দাবি ছিল অধিক স্বায়ত্ব শাসনের।।
যৌথ নির্বাচন ব্যবস্থাও চেয়েছিল তারা,
মুসলিম লীগ চায়নি মানতে এমন কোন ধারা।।
হকের কৃষক শ্রমিক পার্টির সমর্থন পাওয়ায়
শেষ পর্যন্ত এই সংবিধান-প্রস্তাব পাশ হয়ে যায়।।
তেরো শো বাষট্টি সনে ঢাকায় আরেকবার
সংখ্যালঘু হয়ে পড়ে প্রাদেশিক সরকার।।
সাংবিধানিক ক্ষমতার করে অপব্যবহার
কসুর করেন নি যদিও সরকার বাঁচাবার
গভর্নর হক গণতন্ত্রের তোয়াক্কা না করে,
শেষ পর্যন্ত আবু হোসেনের এই সরকার যায় পড়ে।।
এরপর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে একটি কোয়ালিশন
করে ফেলে নূতন প্রাদেশিক সরকার এক গঠন।।
সংখ্যালঘু কিছু দল এই জোটকে করে সমর্থন,
আতাউর রহমান খান সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হন।।
কয়েকদিন পরে কেন্দ্রেও হয় নূতন কোয়ালিশন,
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এক সরকার হয় গঠন।।
সোহরাবর্দি প্রধানমন্ত্রী হন এই সরকারের —
কেন্দ্র ও প্রদেশে এবার সরকার এক দলের।।
যদিও স্বল্পকালস্থায়ী ছিল এই সংযোগ,
বাংলার জন্য নেওয়া হয় নানা উন্নয়ন-উদ্যোগ।।
শিল্পায়নের লক্ষ্য নিয়ে প্ল্যানিং বোর্ড গঠন,
কৃষি ও শিক্ষার সংস্কারে অর্থের অনুমোদন,
শাসন ও বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ,
বন উন্নয়ন, স্থায়ী শিল্প ট্রাইবুনাল গঠন,
সাভারে ডেয়ারি ফার্ম প্রতিষ্ঠা, গ্যাস কারখানা স্থাপন,
সেচ-সুবিধায় বোর্ড গঠন আর বন্যা নিয়ন্ত্রণ,
বাংলা অ্যাকাডেমির উদ্যোগ পুস্তক প্রকাশনে,
ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠা ঢাকার উন্নয়নে,
নানা শহর যুক্ত করতে বহু সড়ক নির্মাণ —
এসব ছিল এই সরকারের কয়েকটি অবদান।
[ধুয়া — “আহা, বেশ, বেশ, বেশ! আহা, বেশ, বেশ, বেশ!]
পূর্ববঙ্গের রাজনীতির গল্পে সাময়িক ক্ষান্তি দিয়া
সভাজন, এইবার চলুন আসি পশ্চিমবঙ্গে ঘুরিয়া।।
সেই বঙ্গে কী কী ঘটেছি শতকের এই সময় —
আসুন বন্ধু, এইবার আমরা নেব তার পরিচয়।।
ব্রিটিশ ভারতের বিহার ও উড়িষ্যা ছিল এক প্রদেশ,
বাঙালিপ্রধান মানভূম ও ধলভূম তার অংশবিশেষ।।
বঙ্গভঙ্গ রদ হবার পর তেরো শো আঠারো সনে
এ বিন্যাস যখন ঘটেছিল রাজ্যের পুনর্গঠনে,
স্থানীয় বাঙালি নেতারা এর করেছিলেন প্রতিবাদ
কংগ্রেসের নেতারা তবু এতে করেননি কর্ণপাত।।
বাংলা ভাষার অধিকার সেখানে ছিল সংকুচিত,
তার প্রতিষ্ঠায় বাঙালিরা তখন প্রথম হয় সংগঠিত।।
অধিকারের এই লড়াই ছিল বিহারীদের সঙ্গে —
তখনই জন্মেছিল সংকল্প যুক্ত হতে বঙ্গে।।
মানভূম বাঙালি সমিতির স্থাপনা হয় এর পরে
ব্যারিস্টার পি আর দাশকে প্রথম সভাপতি করে।।
অব্যাহত রাখতে প্রসার বাঙালির সংস্কৃতির
বাংলা স্কুল স্থাপন অন্যতম কাজ ছিল ওই সমিতির।।
রাঁচি, পালামৌ, সিংভূম, মানভূম ইত্যাদি অঞ্চল লয়ে
বঙ্গভাষী প্রদেশ গঠনের প্রস্তাবও উঠেছিল এক সময়ে।।
স্বাধীন ভারতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য হলেও গঠন
বাঙালিদের এই সমস্যাগুলির হয়নি নিরশন।।
তখনো মানভূম অঞ্চল ছিল বিহারের অন্তর্ভুক্ত,
হলেও বঙ্গভাষীপ্রধান বঙ্গে তা হয়নি যুক্ত।।
বাঙালিদের বাংলাভাষায় শিক্ষার অধিকার
কেড়ে নিতে সচেষ্ট হয় বিহারের সরকার।।
সেখানেও যেখানে ছিল বাঙালিরা সংখ্যাগুরু,
হিন্দিভাষা চাপাবার চেষ্টা হয়ে গিয়েছিল শুরু।।
স্কুল-কলেজে, আদালতে ও সরকারি দপ্তরে
বাংলাভাষার দাবি অগ্রাহ্য ছিল যে সর্বস্তরে।।
জেলা স্তরে ছিল যত সরকারি বিদ্যালয় —
বাংলা বিভাগগুলি সেথায় উঠিয়ে দেওয়া হয়।।
বিহার রাজ্যে হিন্দিই হবে একমাত্র রাজভাষা —
এ ঘোষণা বাড়িয়ে তোলে বাঙালিদের হতাশা।।
বাঙালিরা সব রুখতে চেয়ে হিন্দির এই আগ্রাসন
রাজ্যের কংগ্রেস দলের কোন পায় নি সমর্থন।
পুঞ্জিত হতে থাকে এর ফলে তাদের অসন্তোষ —
বিভূতি দাশগুপ্ত, লাবণ্যপ্রভা ও অতুলচন্দ্র ঘোষ,
রজনী সরকার, শরৎ সেন আর গুণেন্দ্রনাথ রায়
কংগ্রেস ছেড়ে লোকসেবক সংঘ গড়েন পুরুলিয়ায়।।
লাবণ্যপ্রভা দেবী অতুলচন্দ্রের যোগ্য সহধর্মিনী,
মানভূম-জননী রূপে ওই অঞ্চলে সুপরিচিতা তিনি।।
ক্রমে এই আন্দোলনে আসেন আরও সৈনিক কত —
অশোক চৌধুরী, রেবতী ভট্টাচার্য, ভবানী মাহাতো।।
আরেক ভাষাসৈনিক জগবন্ধুর লেখা এই গানের ভাষায়
কংগ্রেসের নীতিতে বাঙালিদের ক্ষোভ বুঝতে পারা যায়।।

[জগবন্ধু ভট্টাচার্যের রচিত গানের অংশ:-
” প্রাণে আর সহে না
হিন্দি কংগ্রেসিদের ছলনা
ইংরেজ আমলে যারা গো
করতো মোসাহেবিয়ানা
এখন তারা হিন্দি কংগ্রেসি
মানভূমে দেয় যাতনা!…”]
স্বাধীন ভারতের প্রথম ভোট হয় তেরো শো আটান্ন সনে,
লোকসেবক সংঘের সদস্যরা জয়ী হন সেই নির্বাচনে।।
ভজহরি মাহাতো, চৈতন মাঝিরা সংসদ-সদস্য হন,
বিধানসভাতেও নির্বাচিত হন এই সংঘের সদস্যগণ।।
সংসদে ভজহরি সোচ্চারে বলেন, তিনি বঙ্গভাষী,
বিহার সরকারের শাসন থেকে মুক্তি চায় মানভূমবাসী।
অন্য দলের কিছু সাংসদও সমর্থন করেন এই আর্জি–
কমলকুমার বসু, মোহিত মৈত্র ও নির্মলকুমার চ্যাটার্জী।।
বাংলায় শিক্ষার অধিকারের দাবি নিয়ে আন্দোলন
গড়ে উঠলেও অনড় থাকে বিহারের রাজ্য প্রশাসন।।
নির্বিচারে চালিয়ে যায় তারা দমন আর পীড়ন,
ধানবাদ অঞ্চলের হিন্দিভাষী অংশের পায় তা সমর্থন।।
আইন পাস করে এর পর মাঠে নামে বিহার সরকার-
নিষিদ্ধ হয় বাঙালীদের প্রতিবাদসভা আর প্রচার।।
মানভূম জেলায় তীব্র হয়ে ওঠে এই আন্দোলন,
গ্রেপ্তার হলেন অতুলচন্দ্র সহ আরোও বহু জন।।
লোকসেবক সংঘ এর প্রতিবাদে করলে সত্যাগ্রহ
শুরু হয় সংঘের কর্মীদের ওপর পুলিশি নিগ্রহ।।
জনসভায় হয় লাঠিচালনা আর চলে মহিলা নির্যাতন
এর ফলে ক্রমে ক্ষেপে ওঠে আন্দোলনকারীগণ।
[ধুয়া :- “ধিক ধিক ধিক! ওরে ধিক শত ধিক!”]
আন্দোলন দমনে সরকার তখন এমনই মরিয়া
কৃষি সরঞ্জামের বিক্রয় মানভূমে দেয় বন্ধ করিয়া।।
চাষির স্বার্থে আন্দোলনের নেতারা তখন
হাল-জোয়াল সত্যাগ্রহের করেন প্রবর্তন।
কৃষির যন্ত্রপাতি সুলভ করবার উদ্দেশ্যে
তাঁরা শুরু করেন বিক্রি সেসব প্রকাশ্যে।।
টুসু সত্যাগ্রহের শুরু তেরো শ’ ষাট সনে,
প্রতিবাদের নূতন মাত্রা যোগ হয় আন্দোলনে।।
সারা মানভূম টুসু-গানে হয়ে ওঠে মুখরিত —
এর মাধ্যমেই হয় বাংলাভাষার দাবি প্রচারিত।।
[মধুসূদন মাহাতো – রচিত প্রতিবাদী গানের অংশ :-
মন মানে না রে হিন্দি সহিতে।
ভাষা মোদের হরে নিল হিন্দীতে।।
মাতৃভাষা হরে যদি
আর কি মোদের থাকে রে।
(তাই) মধু বলে মাতৃভাষার
ধ্বজা হবে বহিতে”]
এসব গান গায় সাধারণ লোকজন, কৃষক, দিনমজুর
গানের ভাষায় ধ্বনিত হয় প্রতিবাদের সুর।।
অরুণ ঘোষ আর ভজহরি মাহাতো মানভূমের সন্তান —
এরা দুইজনও লিখেছিলেন প্রতিবাদের কিছু গান।।
[ মানভূমের ভাষাসৈনিক ভজহরি মাহাতো রচিত প্রতিবাদী গানের অংশ:-
“শুন বিহারী ভাই,
তোরা রাখতে লারবি ডাঙ দেখাই,
তোরা আপন তরে ভেদ বাড়ালি,
বাংলা ভাষায় দিলি ছাই৷’
ভাইকে ভুলে করলি বড়
বাংলা-বিহার বুদ্ধিটাই।।
বাঙালী-বিহারী সবই
এক ভারতের আপন ভাই
বাঙালীকে মারলি তবু
বিষ ছড়ালি—হিন্দী চাই।।
বাংলা ভাষার পদবীতে ভাই
কোন ভেদের কথা নাই।
এক ভারতে ভাইয়ে ভাইয়ে
মাতৃভাষার রাজ্য চাই।’
অরুনচন্দ্র ঘোষ রচিত প্রতিবাদী গান :-
“আমার বাংলা ভাষা প্রাণের ভাষা রে।
(ও ভাই) মারবি তোরা কে তারে।।
বাংলা ভাষা রে।।
এই ভাষাতে কাজ চলছে
সাত পুরুষের আমলে।
এই ভাষাতেই মায়ের কোলে
মুখ ফুটেছে মা বলে।।
এই ভাষাতেই পরচা রেকর্ড
এই ভাষাতেই চেক কাটা
এই ভাষাতেই দলিল নথি
সাত পুরুষের হক পাটা।।
দেশের মানুষ ছাড়িস যদি
ভাষার চির অধিকার।
দেশের শাসন অচল হবে
ঘটবে দেশে অনাচার।।”]
পুলিশি পীড়নেও চলে মানভূমে বাঙালিদের প্রচার,
জনা চল্লিশ সত্যাগ্রহী হন, এরপর গ্রেফতার।।
দমাতে পারেনি এদের শাসক শক্তির রোষ।।
ভজহরি ও কালীরাম মাহাতো, অতুলচন্দ্র ঘোষ
লাবণ্যপ্রভা, ভাবিনী মাহাতো প্রমুখ নেতাগণ
অদম্য, নির্ভীক চিত্তে করেন গ্রেফতার বরণ।।
[ধুয়া — “আগে কহো আর, শুনি, আগে কহো আর!”]
পুরুলিয়া, সাতুরি, ঝালদা আর রঘুনাথপুর–
নানা স্থানে পুলিশ চালায় নির্যাতন প্রচুর।।
ভাঙচুর এবং লুটপাট চলে সত্যাগ্রহীদের ঘরে,
ভাঙচুর হয় লোকসেবক সংঘের মধুপুরের দপ্তরে।।
টুসু গান গাওয়ায় পায় না রেহাই বালক কিশোরগণ,
বাবুলাল, সুধন্য, হরিপদ মাহাতো এদেরই কয়েকজন।
এসব নাবালকদের শুধুই করা হয় না গ্রেফতার,
এদের বাড়ির গরু-মোষ, ঢেঁকি বাজেয়াপ্ত করে সরকার।।
প্রচুর টুসু-গানের বইও এরপর করা হয় বাজেয়াপ্ত —
তবুও হয় না বাঙালিদের এই আন্দোলন সমাপ্ত।।
ক্রমে ক্রমে মানভূমের সব বাংলাভাষী চায় —
বঙ্গভাষী মানভূম যুক্ত হোক পশ্চিমবাংলায়।।
তেষট্টি সনে আন্দোলনে জুড়ে নূতন মাত্রা,
সত্যাগ্রহী জনগণ শুরু করে এক পদযাত্রা।।
‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ সঙ্গীত আর টুসু-গান গেয়ে
এগিয়ে চলে সেই পদযাত্রা সুদীর্ঘ পথ বেয়ে।।
পুরুলিয়ার পাকড়াবিরা গ্রামে করে শপথ গ্রহণ
কলকাতার উদ্দেশে যাত্রা করেন সত্যাগ্রহীগণ।।
মানভূম জেলার বঙ্গভুক্তি দাবি করেন তাঁরা —
সহস্র মানুষের মধ্যে জাগে বিপুল সাড়া।।


সতেরো দিনে পার হয় তারা তিনশো কিলোমিটার–
কলকাতায় এসে সমাপ্তি হয় সেই পদযাত্রার।।
অতুলচন্দ্র সভা করেন কলকাতার ময়দানে,
জ্যোতি বসু, হেমন্ত বসুরা ভাষণ দেন সেইখানে।।
মহাকরণ অবরোধ করতে এগোন সত্যাগ্রহীগণ,
পুলিশের হাতে কয়েক হাজার মানুষ গ্রেফতার হন।।
বিধান রায়ের কংগ্রেস সরকার হয়ে দিশাহারা
মিছিল রুখতে জারি করে একশো চুয়াল্লিশ ধারা।।
এ লড়াই ভারতের কেন্দ্রীয় স্তরেও তোলে আলোড়ন,
গঠিত হয় অতঃপর রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন।।
অবশেষে মানভূম জেলার বঙ্গভাষী অঞ্চল নিয়া
গঠিত হয় পশ্চিমবঙ্গের নূতন জেলা পুরুলিয়া।।
[ধুয়া — “আহা, বেশ, বেশ, বেশ! আহা, বেশ, বেশ, বেশ!]
নূতন এক কীর্তিমান বাঙালি করে সেদিন অর্জন –
বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এই ভাষা আন্দোলন।।

