শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

মায়ের কাছে ‘পাওয়া’-চাওয়া

“অপনি মর্জি সে কঁহা অপনি সফর কি হমনে,
রুখ হাওয়ায়োঁ কা জিধর হৈ উধার কি হম নে।” শায়ের জনাব নিদা ফাজলি।

( নিজের ইচ্ছেয় আর ভ্রমণ হোল কোথায়, যে দিকে বাতাসের গতি সেদিকেই গেলাম আমি)

দুখিরামের এক অনুজ-প্রতিম সহযাত্রীর সঙ্গে এককালে প্রায় প্রতিদিন একই বার্তালাপ হত। সেই অনুজ বাক্যালাপ শুরু করত এই ভাবে “কি পেলাম জীবনে? যা পাবার সব আপনাদের মতো লোকেই পেল”।

আলাপিত হবার প্রথম অধ্যায়ে দুখিরাম বুঝতেই পারতোনা তার না-পাবার অর্থ কী! অধীত বিদ্যা বুদ্ধির যথাযোগ্য চাকরি। আ-নখ-শির পোষাকে কোন দৈন্যের লেশ মাত্র নেই, আজীবন স্বগৃহের অন্ন ও আনন্দ উপভোগ ( অর্থাৎ কর্ম উপলক্ষে দুখিরামকে যে বারবার বাধ্যতামূলক হাওয়া বদল করতে হয়েছে – সে পাপ মুক্ত), বিজ্ঞাপনের পণে জিতে আনা স্ত্রী (পরে পুত্রবতী), দুর্জনে বলে নোট বন্দীর সময় সে আর দশ জনের থেকে বেশি বই কম চিন্তায় ছিল না – তবে এই হাহারবে তার তার-ছেঁড়া কেন ?

আরম্ভে দুখিরাম ইতস্তত চেষ্টিত হত তার ভ্রম ভঞ্জনে কিন্তু কালক্রমে বুঝতে পারল ক্ষ্যাপা যেমন পরশ পাথর খোঁজাটাকে অভ্যাস মাত্র পরিণত করেছিল তেমনি এ জন অলীক না পাওয়ার মায়ায় নিজেকে মগ্ন রেখেছে। যে অভাব আমার মিশেছে স্বভাবে সে দুঃখের চিন্তা বড় শান্তিদায়িনী। ‘আমি বড় দুখী’ এ ভাবনার তুলনা যেন তোমারি তুলনা তুমি প্রাণ। শিশু যেমন মাকে – নামের নেশায় ডাকে – তেমনি কবি ভাষ্য আর কি।

কিন্তু তাকে বোঝাবার বালখিল্য প্রয়াস থেকে বিরত হয়ে সত্যিই দুখিরাম আজ একটু ভাবতে চায় জীবনে কি পেয়েছে বা আদৌ কিছু পেয়েছে কিনা। এ প্রশ্নের জবাব খোঁজার জন্য নান্দীমুখেই জানতে হবে ‘পাওয়া’ কাকে বলে । অনুজের প্রাতঃকালীন আর্তনাদ কি পুরোপুরি ভুল না কি তার প্রতি কিছুটা অবিচার করা হয়ে যাচ্ছে। আসুন পাঠক সে ভাবনা আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যাক।

সরকার ঘোষিত প্রবীণ দুখিরামের শৈশব কেটেছে একটি মফস্বল শহরে, আপাতত মহানগরের বাসিন্দা । ধীরে ধীরে তার অগ্রগতির চাকায় ত্বরণ লেগেছে। রেডিও প্রথমে উচ্চ-মধ্যবিত্তের প্রতীক ছিল, তারপর সে প্রতীক হাত বদল হতে হতে আজ স্মরণের বালুকাবেলায় সমাহিত। ঘরে ঘরে লেগেছে দূরদর্শনের অ্যান্টেনা – অধুনা সেও না – ছাদে ছাদে আকাশ প্রদীপ – বিশ্ব আজ নিঃস্ব হলেও গৃহকোণে দৃশ্যমান। পায়ের তলায় সর্ষে – সাইকেল থেকে স্কুটার থেকে বাইক। দ্বিতীয় হাত নয় -ধারের ভারে আজ আছে তাজা ফিতে কাটা গাড়ি। ছোট শহরের বড় বাড়ি ছেড়ে বড় শহরে ছোট বাড়ি। পিয়ন থেকে টেলিফোন ঘুরে মুঠোফোন।

জট পাকানো বাপের সুট হাঁকানো ছেলে। মেয়েদের গল্পও আর অল্প নয়। কালকের বালিকারা আজ চালিকা শক্তি। দুখিরাম দপ্তরে প্রান্তরে তাদের নিত্য কুর্নিশ করে । তিন অঙ্কের মাইনে ক্রমে চার—পাঁচ– ছয় সংখ্যায় । তবে কেন এ না-পাওয়ার ক্রন্দন ?

প্রশ্নটি কিছুটা কঠিন, কারণ প্রচলিত সমাজ শাস্ত্র, ন্যায় শাস্ত্র রাষ্ট্র বিজ্ঞানের দ্বারস্থ হলে নেহাত অবিচারের সম্ভাবনা। বৈয়াকরণের বৈজয়ন্তী ঊর্ধ্বমুখী হবে, পাণিনির পা ফসকাবে, চাণক্যের মতানৈক্য ঘটবে, কিন্তু জবাব ? কালের রাখালের যে বাঁশির সুর নিত্য বাজে মহাকালের অঙ্গনে, তারি মত জবাব থাকবে ধরার কাছে কিন্তু ছোঁয়ার বাইরে। অধরা। তবে সুরের সূত্র ধরে লালন সাই এর দরবারে মিলতে পারে সে সন্ধান। আরশি নগরের পড়শির কাছে।

আসলে দুখিরাম বলতে চায়, আমি কি পেলাম তা গৌণ, পড়শি কি পেল সেখানেই রয়েছে ব্যথার জন্মভূমি। পড়শির পাওয়ার আরশিতে আমাদের না-পাওয়ার আত্মদর্শন। বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটলে আমরা আগে দেখি পাশের ঘরের অবস্থা। যদি সেটিও বিদ্যুৎ-হীন হয় তবে আরামের শ্বাস ছেড়ে তাল পাতার পাখা চালাই । আমার কষ্ট তো প্রতিবেশীর কষ্টের সঙ্গেই লাঘব হয়েছে। আর দায়িত্বও এখানেই শেষ। প্রতিবেশীর ছেলেটি বই পোকা হলে আমার ছেলেটি নিত্য নিন্দিত হয়, তার বাগানে কলা ফললে আমার পেয়ারা পানসে হয়ে যায়, তার সুরম্য বাড়িটি – আমার মাত্রাতিরিক্ত সাজানো ফ্ল্যাটে আমাকে শান্তিতে চা খেতে দেয় না। আমার মেয়ের গান তার মেয়ের থেকে শ্রুতি নন্দন হওয়াই চাই, আর তার স্ত্রী… না আর কথা বাড়াবার প্রয়োজন দেখি না। মোট কথা মানুষের সুখ নির্ভর করে অন্যের সুখাল্পতার উপর। আলোচনার আরম্ভে যে না-পাওয়ার উল্লেখ করা হয়েছে তার নিত্য নিবেদনের দুখের প্রদীপ সেখান থেকেই তেল সরবরাহ পায়। বাদ বাকি “বুঝ লোক যে জান সন্ধান”।

দুখিরামের অনেক গুরু দুনিয়ায়। বস্তুত সে যেখান থেকেই কিছু পায় জাতি-ধর্ম-বয়স নির্বিশেষে সেখানেই গুরুর কবলে বসে। তেমনি এক গুরু বলে ছিলেন ‘সুখে থাকা কর্পোরেশনের জলের মত অনায়াস লভ্য নয়, আবার খুব কষ্টার্জিতও নয়। আসলে সুখে থাকা – ভাবার মতই practice করতে হয় এমনি আনন্দে থাকাও practice করা চাই। আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়ালে বিশ্ব-লোকের সাড়া পাওয়া কঠিন হবে না।

তা যদি না হয় তবে অনন্ত জিজ্ঞাসাই ভবিতব্য “জীবন তো দিল অনেক, তবে ‘পাওয়া’ হল কি?”

পাওয়ার বড় পায়াভারী – তার পাল্লা ভারিই হতে চায় না।

তবে আশ্বিনের ভোর বড় সাংঘাতিক। একদিন ব্রহ্ম মুহূর্তে ‘শুভ্র শঙ্খ রবে’ জেগে উঠেই বাঙালির মনে হয় ‘ আর তো চিন্তা নাই রে’ কারণ ‘জননী এসেছে দ্বারে’। কয়েকদিনের জন্যে আপামর বাঙ্গালি চাওয়া পাওয়া কিম্বা পাওয়া চাওয়ার ধন্ধ তাকে তোলা থাকে। বছরে তিনশো পঞ্চাশ দিনের মিতব্যয়ী পিতা ছেলে ডেকে দাবি ছাড়াই হাতে তুলে দেয় সম্মানজনক অন্নপূর্ণ ভাতা। দয়িতা ও দুহিতার জন্যে কাপড়ের বস্ত্র বিপণীতে ঘটে যায় উদার অভ্যুদয়। ভুলে যাওয়া বন্ধুদের মুঠোফোনে খোঁজ পড়ে। দূরে থাকলে মা-বাবার ও তত্ত্বতালাশ হয়। অম্বলের রুগী খেয়ে নেন ডিম গোটানো সুখাদ্য (!)। রক্তচাপের চিন্তা মুক্ত কেউ ‘সুরুত’ করে টেনে নেন কচি পাঁঠার মজ্জা। মোটামুটি কিছু দিন সমস্তই শান্তি কল্যাণ হয়ে থাকে।

পুষ্পাঞ্জলিতে অর্পণ করার কথা হৃদয় বাসনাও। এবার মাকে বলবে দুখিরাম। ‘কি পাইনি’ সেই অনন্ত অভিলাষ নিয়ে যাও মা। যেন মুক্ত কন্ঠে বলতে পারি, ঠাকুরের বানী ‘যা দেখেছি যা পেয়েছি তুলনা তার নাই’।

অলম ইতি।

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x