শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

গ্রীষ্মের আনতনয়না গোধূলি। নদীর গা ছাড়া স্রোতে আলসি নাওয়ের দুলুনি। দিনান্তের সমাপন সুরে পৃথিবী থমকে আছে — ঢালু আলোয় ঢেউ খেলছে দুজন ছায়া। ওরা দুজন।
: কি হলো ?
: না তেমন কিছু না।
: তাহলে ? মুড অফ – ঝগড়া করেছো ?
: অপ্রস্তুত লাগছে।
: হঠাৎ ?
: শেষ বেলাকার এই ক্ষণিক সৌন্দর্যের সামনে বসে মনে হয়, হাউ মাচ ডু উই ডিজার্ভ ইট, this poetry of the earth! যতবার দেখি আস্তাবলের ধোঁয়া কাটিয়ে এই সূর্যাস্ত এখনও অকৃপণা সুন্দরীর মতো আমায় আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরতে চাইছে, নিজেকে কৃতঘ্ন, অনুপযুক্ত মনে হয়।”


: তোমরা সূর্যাস্ত শুধু দেখো, আমি তাকে দৈনিক দু হাত দিয়ে স্পর্শ করি।
: মানে?
: আমার শোবার ঘরটা ভরিয়ে দিয়েছি শুধু সূর্যাস্ত আর সূর্যোদয়ের ছবিতে। ওগুলো দেখি, ছুঁই আর মনকে বোঝাই, হ্যাঁ, এগুলোই আমাকে শান্ত করে, স্নিগ্ধ করে। এটা একধরণের অভ্যেস। সাইকোলজিক্যাল রেডিনেস |
: ফেক ইমোশন। এক ধরণের কম্প্রোমাইজ।
: তাতে কি এলো গেলো। আল্টিমেটলি ইট ইজ দ্য ফিল গুড ফ্যাক্টর দ্যাট ইজ ইম্পর্টেন্ট।
: দামি পারফিউমের মতো, চটুল প্রেমের গপ্পের মতো, মলের শো:রুমে সাজানো দামি পোশাকের মতো, তাই না ?
: একদম। এই তো ধরে ফেলেছো! রোমিলাকে চেনো তো? — ও ডিপ্রেশন কাটাতে মলে ঘুরে বেড়ায়; নিজের প্রিয় শো:রুমগুলোর সামনে চুপচাপ বসে থাকে। পোশাকগুলোর রঙ, নকশা, তাদের গায়ে পড়া আলো আর চারপাশে ভেসে থাকা সুগন্ধ, সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত থেরাপি নিঃশব্দে ওর বিষণ্ণতার ঢেউগুলোকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে ধীরে ধীরে শান্ত করে দেয়। আসলে কি জানো, ডুব দিলে জটিলতা বাড়ে শ্বাসকষ্ট হয়, ভেসে থাকলে অল ইজ ওয়েল।


: মানুষ ভাঙছে, ভেঙে টুকরো টুকরো হচ্ছে আর সেটাকে জোড়াতালি দিয়ে ঢাকবার জন্য তোমাদের এই তথাকথিত ‘ফিল গুড’:এর দাসত্ব। এই ফিল গুড জিনিসটা কি জানো? সিম্পলি পেনকিলার। Type of mental insulation!
: ওই দেখো ওই বৃদ্ধকে। এই বয়েসেও কেমন হ্যাপিবাবু স্নান সেরে মস্তি করে ধুতি পরছে। ওই মহিলাটিকে কি বলবে ওই যে একটার পর একটা দেশলাই পুড়িয়ে প্রদীপটা জ্বালাতে পারছে না। ও যে বারবার ফেইল করছে : কিন্তু উদ্যমটাকে টিকিয়ে রেখেছে, ঐটাই ওর ‘ফিল গুড’ ফ্যাক্টর। ডিনাই করতে পারো কি?
: ওদের মধ্যেও কোথাও একজন নিরন্তর শূন্যতা লুকিয়ে আছে। আমরা দেখতে পাই না। ওরা নিজের ছায়ার দায়ে বেঁচে আছে। আমরা বুঝতে পারি না বা বুঝে শুনে এড়িয়ে চলি |
: বলেছি না, এই মাইন্ড সেট চেঞ্জ না করলে কোনোদিন তুমি ভালো থাকতে পারবে না।
: এখন ভালো থাকাটা codefied algorithm।
: দাড়ি কামাওনি, চুল কাটোনি, আমার দেওয়া নেইল কাটারটা হারিয়েই ফেললে। কেন গো নিজেকে এতটা ঘৃণা করো ?
: হয়তো করি। কিন্তু তারও একটা নেশা আছে। আত্মঘৃণার মাদকতা। যেন যত বেশি পচন দেখি, তত বেশি তার মধ্যে ডুবে যেতে ইচ্ছে করে। জানো, দস্তয়েভস্কির এক চরিত্র বলেছিল— “আমি অসুখী, তাই আমি আছি।”
: তুমি শাস্তি খুঁজছো।
: হয়তো তাই। মানুষ শান্তি চায়, কিন্তু মনের গভীরে শাস্তির আকাঙ্ক্ষাই বোধ হয় বেশি সত্য। । শান্তি তো শুধুই স্থিরতা, আর শাস্তি মানে অনুভব— যতই যন্ত্রণাদায়ক হোক, সে কিন্তু জীবন্ত !
: তবু ফিরে আসো এই নদীর ধারে, এই আলোয়, এই সন্ধ্যার মুখোমুখি হতে। কেন , কি আশা করে?
: আমি আসি যেমন এক অপরাধী আসে, নিজেই নিজের বিচার চাইতে ।


নদীর জলে আলোটা তখন আরও গাঢ় হয়ে এসেছে। ছায়াগুলো জলের তলায় ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। নৌকোগুলোতে একে একে জ্বলে উঠছে আলো। টিনের লণ্ঠনের কাঁচে কাঁপছে আগুন, যেন নদীর বুকে জোনাকিরা। কেউ কেউ জাল মেলে রেখে জোড়হাতে মুখ তুলে নামাজে বসেছে, ভেসে আসছে নিম্নস্বরে উচ্চারিত আয়াতের ধীর ধ্বনি। ওরা চুপচাপ বসে থাকে।
ঘাটের পাশে মন্দিরে শাঁখ, উলুধ্বনির প্রতিধ্বনি আরও তীব্র হয়ে উঠছে। গঙ্গায় স্নান শেষে ভিজে কাপড়ে ওরা তেলসিন্দুর মাখা যুপকাষ্ঠের চারপাশে একাগ্রে দন্ডি কাটছে। মাটির ঘন কাদা গা:মাথা ঢেকে দিচ্ছে। কপালের সিঁদুর গলে নেমে মিশে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে সবাই যেন এক প্রাচীন যজ্ঞের অগ্নিকুণ্ডে আত্মসমর্পণকারী দেহমূর্তি। প্রতিটি দন্ডি যেন একেকটি আত্মশাস্তি, একেকটি ধীর আত্মবিনাশের অনুশীলন। শরীরের সীমা ঘুচিয়ে ওরা মিশে যাচ্ছে মাটিতে | ভক্তির উন্মাদনায় লুকিয়ে আছে এক নীরব আত্মবিসর্জনের ক্রিয়া, এক অনুচ্চারিত আত্মবিধান। ওরা কেউ ওদের প্রার্থিত ঈশ্বরকে দেখেনি। দেখবেও না। সবটাই ভেবে নেওয়া। মেন্টাল কন্ডিশনিং। ওরা চুপচাপ বসে থাকে।
তারপর আশ্চর্য সন্ধ্যায়, কথার পিঠে কথা সাজিয়ে সাঁকো গড়তে গিয়ে ওরা মিলিয়ে গেলো অন্ধকারে। জোয়ারের জল এসে কামড়ে নিয়ে চলে গেলো বসবার জায়গাটুকু, উপস্থিতির ক্ষীণ আভাসটুকু।

প্রায়শই সে বাড়ি ফিরত সন্ধ্যেবেলা। সময় কাটাতো পেশেন্স খেলে, কিংবা ঘন্টায় ঘন্টায় কাঁচের বাক্সে ঘড়িপরীর নাচ দেখতে দেখতে, কিংবা শৈশবের স্ট্যাম্প কালেকশনের আলবামের পাতা উল্টিয়ে। আজ বেশ কিছুটা দেরি হয়ে গেলো। পথে রেবেকার সঙ্গে দেখা হয়েছিল— মুকুন্দর চায়ের দোকানের সামনে। একসময় রেবেকা ছিল এই শহরের অলিগলির চেনা নাম—রাত নামলেই যার হাসির ঝলকে নেচে মাতাল হতো বিক্ষিপ্ত আবেগের অশান্ত হৃদয় |
এখন সে হাসি নিভে গেছে। চোখের কোণে কালি, ঠোঁটে ক্লান্তি, আর গলায় করুণ ভাঙন। সময় যেন তার শরীর থেকে রঙ চুষে নিয়েছে, শুধু অবশিষ্ট রেখেছে অবসন্ন অবয়ব—ম্লান, অথচ পরিচিত।
রেবেকা বললে : “দেখা যখন হয়েই গেলো, চলো না আগের মতো কোথাও নিরিবিলিতে একটু বসি।”
চুপ করে মাথা নেড়ে সে হাঁটতে শুরু করলো। কাম নয়, করুণ এক টান অনুভব করলো দুজনে। মনে এলো সেই খুপরি ঘর, তেলচিটে বিছানার চাদর, টেবিলে ধুলো জমা গ্লাস, কোণে ভাঙা হারমোনিয়াম, নগ্ন শরীর আর রেবেকার খালি গলায় গান : আমার সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়।
“গান গাও এখনো ?”
“ওসব দুঃসাহস উবে গেছে অনেকদিন।”
“দীপকের কি খবর ? “
“ভেগে গেছে।?”
“আশ্চর্য হতাম যদি অন্য কিছু বলতে । “
“যেদিন বুঝলো ওর খিদে আমি আর মেটাতে পারবো না সেদিন থেকেই ওই কাঠের পা দুটো খুলে মারধর শুরু করলে | শেষের দিকে ও অন্যরকম একটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল। তারপর সবার অলক্ষ্যে এক রাতে বাড়ির সামনে আম গাছটা থেকে : “
কথা শেষ হয় না। ঝড়ের গতিতে একটা কালো গাড়ি এসে থামলো ওদের সামনে। চমকে উঠলো দুজনে। কাঁচ নামিয়ে এক বৃদ্ধ, পরণে সাফারি স্যুট, চকচকে টাক, চোখে অধিকারবোধের তাচ্ছিল্য নিয়ে ভাঙা অথচ অভ্যস্ত গলায় ডাক দিলে “রেবেকা ডার্লিং, আজা না রে : বহুত দের হয়ে গেলো।”
রেবেকা একবার লোকটার দিকে তাকালো। তারপর মুখ ফিরিয়ে শুকনো হাসি হেসে বললে, “চলি। তিন মাসের ইলেক্ট্রিকের বিল বাকি।”


গাড়িটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলো চৌমাথার অন্ধকারে। সে তাকিয়েছিলো অনেকক্ষন। নর্দমার জমে থাকা পঁচা জল নিওনের আলোয় রুপোলি হয়ে উঠেছে। রেবেকার মুখটা ভেসে উঠলো। নিষ্ঠূর জীবন। মনে হচ্ছিলো সামনের রাস্তাটা যেন অন্তহীন নদী। এম্বুলেন্সের সাইরেনে সম্বিৎ ফিরলো। দেখলো হাড় জিরজিরে পাঁশুটে একটা শরীর হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে।” গুরু, একটা বাংলা পাইটের পয়সা দিয়ে যাবে কিন্তু, নইলে আজ ছাড়বো না । “
বাড়ির ফিরে পড়ার টেবিলে রাখা গোলাপগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলো। মায়ের মৃত্যুবার্ষিকীতে মন্দিরার পাঠানো ফুল। নির্বিকার শান্তিতে পাপড়িগুলো একে একে ঝরে পড়ছে, কোনো অদৃশ্য নিয়মের সামনে আত্মসমর্পণ করছে। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর প্রতিটি প্রচেষ্টা, প্রতিটি আকুলতা, শেষ পর্যন্ত এক অনিবার্য নীরবতার দিকেই গড়িয়ে যায়। যত যত্নে জল দেওয়া হোক, যত আলোর সামনে রাখা হোক, একদিন না একদিন ফুল ঝরবেই।
ঠিক এই অনুভূতি হয়েছিল সেদিন— যেদিন মাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। ছয় মাসের লড়াই— ওষুধ, ডাক্তার, রাত:জাগা, প্রার্থনা— কিছুই আটকাতে পারেনি সেই শেষ মুহূর্তটাকে। একসময়ে মা:র নিঃশ্বাস থেমে গিয়েছিল, ঠিক যেমন আজ এই গোলাপের পাপড়ি মাটিতে পড়ে আছে— নিরুপায়, শান্ত, অসমাপ্ত এক ভালোবাসার মতো।
মায়ের মন্দিরার প্রতি দুর্বলতা ছিল। খুব পচ্ছন্দ করতো। ইতি হয়ে যাবার দু মাস আগে হসপিটালের বেডে শুয়ে বলেছিলো :” খুব ইচ্ছে ছিল চার হাত এক করে দিয়ে যাবার। সে বুঝি আর হলো না। তুই কিন্তু কথা রাখিস মা।” মন্দিরা মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিল। নতুন ওষুধ গুলো ট্রেতে রাখতে গিয়ে কথাগুলো তার কানে এসেছিলো। ভিসিটিং আওয়ার শেষ হলে ক্যাফেটেরিয়াতে বসে জিজ্ঞেস করেছিল, “মিথ্যেটা বেশ গুছিয়ে বললে?”
চায়ে চিনি মিশিয়ে মন্দিরা বলেছিলো, “ইচ্ছে করে । আর কদিন বাঁচবেন। চলো বাইরে গিয়ে সিগারেট ধরাই। এখানটা বড্ডো সাফোকেটিং।”


ওরা দু’জনে হাসপাতালের পেছনের দিকের ছোট্ট ব্যালকনিটায় এল। চারদিকে ফিনাইলের তীব্র গন্ধ, এয়ার কন্ডিশন মেশিনের ধাতব কাঁপুনি। মন্দিরা ধীরে ধীরে সিগারেট ধরালো, ধোঁয়া ভাসিয়ে দিলো রাত্রির আকাশে। ঠিক তখনই নিচের করিডরে কোনো এক হতভাগ্য পাঁচ:ছয় বছরের শিশুর চিৎকার, কান্না ভেসে এলো। ওরা দু’জনেই তাকালো। এক বৃদ্ধ — হয়তো ঠাকুরদা — ছেলেটাকে কোলে তুলে নিয়ে, বারম্বার কাঁপা কণ্ঠে বলছে, “কাঁদিস না রে, তোর বাবা মারা যায়নি… ডাক্তারবাবুরা চেষ্টা করছে।” ছেলেটা চোখ মুছে থেমে গেলো কিছুক্ষণ, যেন বিশ্বাস করতে চায়, যেন সেই কথাগুলো আঁকড়ে ধরে সে আবার বাঁচতে চায়।
মন্দিরা নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলো সেই দৃশ্যটার দিকে। তারপর ধীরে ধীরে বললো,“সবাই কাউকে না কাউকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে… অন্তত কথার মধ্যে।”
ছেলেটার বাবার দেহ তখনই নিচের করিডরের অন্য প্রান্তে কাপড়ে ঢেকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল — নিঃশব্দে। মন্দিরা শেষ টান দিলো সিগারেটে।
সে বললো, “দেখলে, সত্যিটা কত সহজে মানুষ মিথ্যে দিয়ে ঢেকে দেয়। ওই ঢাকাটাই হয়তো বাঁচিয়ে রাখে আমাদের।”
সিগারেটে ধরিয়ে সে বারান্দায় এসে বসে। নিচের রাস্তাটা প্রায় নিভে আসা শান্ত প্রদীপ। জ্যোৎস্নায় কুচুরি পানার ডোবা থেকে পঁচা পাঁকের গন্ধ উঠে আসতে থাকে । এমনি এক শীতল চাঁদনী রাতে শিবুর মুণ্ডহীন দেহটা পুলিশ ওখান থেকেই উদ্ধার করেছিল। এখনো কাউকে শনাক্ত করা যায়নি। মৃত্যুর কিছুদিন পরে শিবুর বৌ নিখোঁজ হয়ে যায়। কেন যে গেলো , কোথায় যে গেলো কেউ বলতে পারেনা। তবে চায়ের দোকানে জোর গুজব : চম্পা, হুলো মস্তানের তিন নম্বর বৌ হয়েছে , দিশি মদের বেচাকেনা শুরু করেছে। রাত বাড়লে ঠেকে সবাই নাকি ঝুঁকে পড়ে দিশির বোতলের ওপর। আর চম্পা ওদের সামনে হাঁটে, বোতল গুনে টাকা তোলে। তার ঠোঁটে তখন নাকি একরকম অদ্ভুত তৃপ্তি দেখা যায় আর চোখে গনগনে আগুন।
এই চম্পারই রাঁধা সন্তোষী মায়ের ভোগ খিচুড়ি খেয়ে মা বলতো : “ তুই আমার লক্ষ্মী মা। মন দিয়ে সংসার কর। ঠাকুর তোকে রক্ষা করবেন ।” এখন পাড়ার লোকেরা তাকে অখ্যাতি দিয়ে বলছে ” মাগি একদম পচে গেছে। শালি, নিজের খিদে মেটাতে নিজেকেই গিলে খাচ্ছে।’
ছেলেবেলায় তার মুদ্রাদোষ ছিল, থেকে থেকেই জিজ্ঞেস করা : বলো না , কেন এমন হয় ? এখন সে কোনও উত্তরের খোঁজে নেই। উত্তর বলতে কিছু আছে বলেও সে বিশ্বাস করতে পারে না আর। সে বুঝতে চায়— এই সব সুতো ছিঁড়ে যাওয়ার শুরুটা কোথায় ?
সামনের দেবদারু গাছের পাতায় অন্ধকারে হাওয়ার হালকা দুলুনি। জীবনটাও কি তাহলে এমন নিরবচ্ছিন্ন, উদ্দেশ্যহীন দোল খাওয়া? শুরুটা হারিয়ে গেছে, শেষটাও অদৃশ্য। বারান্দার শূন্যতা সান্ত্বনার পাত্র নিয়ে তার একাকিত্বের সামনে দাঁড়ায়। সে চোখ বুজে চুমু খায়। ঘুমিয়ে পড়ে। ভোর হতে তখনও অনেকটাই বাকি।


স্বপ্নালোকে ভেসে উঠলো জনশূন্য শ্মশানভূমি। একজন শীর্ণকায় জটাধারী যেন বহু যুগ ধরে তার অবচেতনে অপেক্ষা করে আছে। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, চোখদুটো গভীর, অতল, প্রশ্নের ওপারে থাকা এক নিশ্চিন্ততা। খুব আস্তে তিনি বললেন— “নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি, নৈনং দহতি পাবকঃ… ন চৈনং ক্লেদযন্ত্যাপো, ন শোষয়তি মারুতঃ।”
তার মনে হলো— সাধুটি যেন তাকে নিজের ভিতরের সবচেয়ে স্থির, সবচেয়ে অনাহত জায়গাটার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। যেখানে কোনো দুঃখ পৌঁছয় না, কোনো ক্লান্তি নয়, কোনো ভয় নয়। চার পাশের মাটি, নদী, গাছ, আকাশ এক অদৃশ্য সুরে ভাসিয়ে দিয়ে তিনি বলছেন, “যা ভাঙছে, তা তুমি নও। যা পুড়ছে, তা:ও তুমি নও। যা ভিজছে, শুকিয়ে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে— সেসবই শুধু পথের ধুলো। তুমি পথ নও, তুমি পথের চালক।”
সে মাথা নিচু করে চোখ বন্ধ করে নদীর ধারে হাঁটু গেড়ে বসে, | নদীর জল স্পর্শ করে তার আঙুল। তার চোখে নিঃশব্দ মুক্তির প্রতিচ্ছবি। সেই স্বপ্নময় রূপান্তর — যেখানে পচন আর মুক্তি একই নদীতে ভেসে যায় | কেবল দৃষ্টির দিকটাই বদলে যায় ।

[লেখকের অন্য রচনা]

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x