
সে প্রায় বারো বছর আগের কথা। এ কাহিনি উড়িষ্যার জগন্নাথের। রঙ কষ্টিপাথরের থেকে এই সামান্য এক পোঁচ কম হবে। সরু একফালি গোঁফ, পেতে আঁচড়ানো চুল, সদাহাস্যমান। পরিষ্কার বাংলা বলত, স্পেশালিটি ছিল গোল গোল উচ্চারণ। যেমন, বাজার কে বলত বজার। সেবার জগন্নাথের প্রথম ইংল্যান্ড আগমন। এবং অচিরেই বিকেলের কিছু দুস্প্রাপ্য ঝালমুড়ি আর উইকএন্ডে ডাল-ভাতের সুবাদে আমি হয়ে উঠলাম, তার বৌদি, ফিলোসফার আর গাইড।
উইকএন্ডে গাড়ি নিয়ে বেরোতাম আমরা। জগন্নাথ ঠিক পিছনে। পিছনে মানে পিছনেই। মাঝে কোন অন্য গাড়ি ঢুকতেই পারবে না! একবার তো ট্র্যাফিকে হলুদ আলোয় বেরোলাম আমরা। অন্ধ ফলোয়ার বেমালুম লাল লাইটে বেরিয়ে চলে এলো পিছনে। তারপর এক সপ্তাহ খুব টেনশনে কাটালেও জগন্নাথ টিকিট খায় নি। আর আমরাও বুঝলাম ওই হেব্বি ইউনিফর্মই সার! নাহলে কোলকাতা পুলিশ আর রাণীর পুলিশে বিশেষ পার্থক্য নেই।
একবার চেশায়ার ওক্সে গেছি সবাই মিলে। এই সূত্রে বলে রাখি, চেশায়ার ওক্স ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় কেনাকাটার জায়গা, চার লাখ স্কোয়ার ফিট যার আয়তন। শয়ে শয়ে ব্র্যান্ডস আর দোকান, রেস্তোরাঁ, ক্যাফে, কী নেই! আমাদের উদ্দেশ্য ঘোরা, কেনাকাটার চেয়েও বেশী দেখা। সেখানে গিয়ে যে যার পথ বেছে নেওয়া হল। ঠিক হল বেলা শেষে এক জায়গায় মিট করে খাওয়া দাওয়া করে বাড়ি ফেরা হবে। মোটামুটি ঘন্টাচারেক সময় রইল হাতে। কিন্তু সবার তো সব সুখ সয় না। আমারো সইল না। এক ঘন্টার মধ্যেই জগন্নাথের ফোনে আর্তনাদ।
“বৌদি, কোথায়?”
আমি তখন সবে গুচ্চির জানালার সামনে হাঁ করা শুরু করেছি কি করি নি।
মারাত্মক সমস্যা! সে নাকি কোন্ দোকান থেকে সোয়েটার কিনেছে একটা। এত অবধি ঠিক ছিল। কিন্তু দোকানের সবকটা সেলস গার্ল নাকি ওকে দেখে হেসে গড়াগড়ি যাচ্ছে। অপমানিত বোধ করে সে বাইরে বেরিয়েই আমাকে কল দিয়েছে।

মুখ দেখলাম অপমানে শুকিয়ে এতটুকু! বরাভয় মুদ্রা দেখিয়ে বললাম, “চলো দেখি!”
চলল জগন্নাথ আগে, আমি পিছনে। দোকানের সামনে গিয়ে আমি আগে জগন্নাথ পিছনে। হওয়ারই ছিল। সে যাক! কিন্তু দোকানে ঢুকতেই মেয়েগুলো জগন্নাথকে দেখেই খোলাখুলি অসভ্যের মত হাসতে শুরু করল। আর কী বলব, আমিও তাতে যোগ দিলাম। আর অচিরেই তা অট্টহাস্যে পরিণত হল। দোকানটা এক বিখ্যাত ব্র্যান্ডের লেডিজ গারমেন্টসের। সেখানে আমাদের জগন্নাথ বার ছয়েক মেয়েদের বিভিন্ন সোয়েটার নিয়ে ফিটিং রুমে ঢুকেছে, বেরিয়েছে, কিনেওছে নিজের জন্য একটা। হাসব না আমরা!
এই জগন্নাথের বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। সেই মেয়ে দেখা আর বাছা নিয়ে একটা পুরো বই লেখা হয়ে যেতে পারে। যাইহোক, ফাইন্যালি একজন ঠিক হল। জগন্নাথ বিয়ে করতে দেশে গেল।
বিয়ের দিন অভাবনীয়ভাবে জগন্নাথের ফোন, ভুবনেশ্বরে তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। আমি তো হাঁ! এখন তো জগুর বিয়ের মন্ডপে থাকার কথা! আমাকে তার কি দরকার পড়ল!
- একি! তুমি কোথায়?
- প্রসেশনে। গাড়িতে।
অর্থাৎ ব্যান্ড বাজা বারাত নিয়ে তিনি তখন যাচ্ছেন বিয়ে করতে। - কত দূর আর?
- আস্তে আস্তে যাচ্ছে তো! আধ ঘন্টা লাগবে।
- আচ্ছা।
- কিন্তু বৌদি!
- কি হয়েছে?
- বৌদি কলারটা …
বাক্যটা শেষ করল না, একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল, শুনতে পেলাম। আমি তো অবাকের ওপর অবাক! কলারে কি হল, যার জন্য আইএসডি কল করতে হচ্ছে! - কি পরেছ?
- শেরওয়ানি।
শেরওয়ানির কলারে কি সমস্যা হতে পারে, সাতপাঁচ ভেবেও খুঁজে পেলাম না। বললাম, - নিজেই তো পছন্দ করেছ!
জগন্নাথ দুঃখিত গলায় বলল – - হ্যাঁ বৌদি! কিন্তু কলারটা এরকম হবে বুঝতে পারি নি!
আমি বেশ ধমকে ঝাঁঝিয়ে বললাম – - ধুর! ছাড়ো তো! কলার দেখতে হবে না। বিয়ে কর গিয়ে। পরে ফোন কোরো।
সেই পর্ব সেখানেই শেষ হলে কিছু বলার ছিল না। রাতে পতিদেব বাড়ি ফিরলে, জানালাম ঘটনা। জগন্নাথ বিয়ের একটু আগেও কলার নিয়ে এত চিন্তিত! তিনি মৃদু হেসে বিচক্ষণতার সাথে বললেন, ওটা বোধহয় কালার হবে, গায়ের রঙ!
কপালে করাঘাত করলাম, হায়! হায়! আমি আমার প্রিয় দেওরের এই গভীর সমস্যায় তার পাশে থাকতে পারলাম না!
একুশ দিন বাদে তিনি বৌ নিয়ে ফিরলেন। এমনিতেই হাসত, হাসি আরো চওড়া হয়ে গেছে, বিনীত ছিলই, বিনয় আরো বেড়ে গেছে। আর কী বলব, আবিষ্কার করলাম জগুভাইয়ের দাঁতের কলার মুক্তোর মতো সাদা!
আর হ্যাঁ, ক’দিন পরে তিনি জানালেন, সেই সোয়েটারটা তিনি বৌকে গিফট করেছেন!


