শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

আমাদের মাষ্টারমশাই

হারিয়ে যাওয়া এক চিরন্তন সুহৃদের কাহিনি, গল্প হলেও যা সত্যি

আমার তখন ক্লাস টেন। টিফিন পিরিয়ডে সব মেয়েরা যখন নিচে নেমে যেত, আমি গিয়ে দাঁড়াতাম করিডরের সামনের বারান্দায় । গেটের সামনে ফেরিওয়ালারা রাজ্যের মুখরোচক খাবার নিয়ে পসরা সাজিয়ে হাজির। আচার,ঝালমুড়ি, আলুকাবলি, ফুচকা আইসক্রিম, আমসত্ব। জিভে জল আনা গন্ধে জায়গাটা মম করতো। সেখানে ছোট ছোট মেয়েদের ভীড়। দেখতে দেখতে সময় বয়ে চলতো। আর খাবারের গন্ধে, ‘ঘ্রাণেন অর্দ্ধভোজনম্’ হয়ে যেত আমার।

এমনি একদিন দেখি দ্রুতপায়ে মাষ্টার মশাই চলেছেন, টিচার’স রুমের দিকে, হাতে মোটা মোটা কয়েকটা বই। চোখ পড়তেই বললেন কবিতা লেখা হচ্ছে তো? – বলেই উত্তরের অপেক্ষা না করেই চলে গেলেন। উনি আমাদের ইংরাজি আর অঙ্ক করাতেন। সাদা পাঞ্জাবি সাদা ধুতি, আর মোটা কালো ফ্রেমের চশমার ভেতর থেকে দুটি তীক্ষ্ণ চোখ, স্নেহমাখা।

আমি সেইসময়ে কোন কবিতাই লিখিনি, কিন্তু যখনই ভিড়ের মধ্যেও আমাকে একাকী দেখতেন ঐ একই কথায় আমাকে বড় লজ্জায় ফেলতেন।

কলেজে পড়ার সময় অবন ঠাকুরের রাজকাহিনীর “গায়েব গায়েবী” গল্পটা নিয়ে একটা কবিতা লিখে সেজদিদির সঙ্গে ধর্মতলার সন্দেশের অফিসে জমা দিতেও গিয়েছিলাম। সেটা বেশ মনে আছে। স্বরচিত সেই কবিতার সঙ্গতিহীন দুচার লাইন এখনও মনে পড়ে। যেমন, “পাঁচ সেরা ভারি সোনার প্রদীপটিতে, / জ্বালাতেন আলো কল্পধেনুর ঘৃতে”। বা, “অভাগিনী আমি সুভগা আমার নাম।”

কিন্তু সে কবিতা আলোর মুখ দেখেনি। সে দুঃখও স্মৃতি থেকে আজও হারায়নি।

আরো অনেক বছর পরে, মহাবালেশ্বরের পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে কণকবরণ অতসীফুলের শোভায় মুগ্ধ হয়ে বাবাকে যে চিঠি লিখেছিলাম। বাবার প্রতিক্রিয়াটি কেমন ছিল জানাতে গেলে সেটা নিজের ঢাক নিজেই পেটানো প্রবাদ বাক্যটি সকলের মনে পড়বেই। তিনি বলেছিলেন, এমন লেখা স্বভাব কবির দ্বারাই সম্ভব। এই ছিল আমার কবিত্বের স্বীকৃতি।

মাষ্টার মশাই কি জন্য যে আমাকে কবিতা বিশারদ ঠাউরে ছিলেন বলতে পারিনা।

মাষ্টার মশাইয়ের পড়ানোর মধ্য ছিল এক অনন্যতা। সিলেবাসকে গুরুত্ব না দিয়ে বিশ্বের তাবৎ মহাকবিদের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেবার এক আশ্চর্য ক্ষমতায় তাঁর ক্লাস আমাদের কাছে এত প্রিয় হয়ে উঠেছিল। জানাবার চেয়ে জানার আগ্রহ তৈরি করতে তিনি ছিলেন শিল্পীর মতো সুদক্ষ। একঘন্টার ক্লাস নিমেষে শেষ হয়ে যেত।

এমন ভাললাগার দিনগুলো কালের বিধানে দূরে সরে গেল। এল কলেজ জীবন। এক ধাক্কায় বড় হয়ে গেলাম। কিন্তু মাষ্টারমশাইয়ের মতো সাহিত্যরসে মগ্ন মানুষের সান্নিধ্য কি জীবনে সহজে মেলে?

আমরা জানতাম মাষ্টার মশাই কোচিং ক্লাস করেন স্নাতকোত্তর শ্রেণী পর্যন্ত। কিন্ত কলেজের মাইনে ইত্যাদির সঙ্গে কোচিংয়ে পড়বার মতো অবস্থা আমাদের ছিলনা। সব জেনেও একদা এক বন্ধুর সঙ্গে মাষ্টার মশাইয়ের ক্লাসে উপস্থিত হলাম। মনে হল তিনি খুসি হয়েছেন। সেদিন ক্লাশে বসে তাঁর পড়ানো উপভোগ করলাম। ক্লাসের পর মাষ্টারমশাই বল্লেন, কাল থেকে তোমরা আসছো তো?

আমাদের মুখের বিনি ভাষার ভাবে তিনি কিছু একটা আন্দাজ করে বললেন। সব ঠিক হয়ে যাবে।

পরদিন ওনার সঙ্গে দেখা হতেই বললেন, আমার বন্ধুর মেয়েটা সংস্কৃত পড়তে চায়না, ওকে প্রতি রোববার পড়াবার ভার তোমায় দিলাম। মাষ্টার মশাইয়ের কথামতো পড়ানো শুরু হল, মাসান্তে পেলাম পারিশ্রমিক। তাই দিয়ে স্বচ্ছন্দে কোচিং ক্লাশের খরচা চলে গিয়েও কিছু থাকতো। বন্ধুকেও একটা ঠিকানা দিয়েছিলেন, সেকালের এক পত্রিকার কর্ণধারের কন্যাকে অঙ্ক করাতে হবে।

এইভাবে, তিনি আমাদের জীবনে নিজের পায়ে দাঁড়াবার ব্যবস্থা করে দিতেন। কতজন যে তাঁর এই দাক্ষিণ্যে জীবনে স্বাবলম্বী হয়েছে তা পরবর্তীকালে জেনেছিলাম। সে সব ভাবলে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে।

এর পর অনার্স সহ বিএ পাশ করে

তাঁকে প্রণাম করতে গেলাম তাঁর বাড়ি।

তিনি আশীর্বাদ করলেন, একটি wrist watch দিয়ে। আমি অবাক বিস্ময়ে স্তব্ধ, আমার নীরবতা ভঙ্গ করে বললেন সঙ্কোচের কারণ নেই ।

এই ভাবে তিনি ছাত্র ছাত্রীদের প্রেরণা দিতেন।

তারপর আর কোন যোগাযোগ রাখতে পারিনি। এবার চাকরিজীবন। বন্ধুদের সঙ্গে প্রথম পুরী যাওয়া। উঠেছি সমুদ্রের ধারেই সাগরিকা হোটেলে। পরদিন চক্রতীর্থ থেকে সমুদ্রের পাড় ধরে হাঁটছিলাম, কখন যে সেই ঘড়িটা হাত থেকে খুলে পড়ে গেছে বুঝতে পারি নি। দিনান্তবেলার অন্ধকারে সমুদ্র আর তটভূমির ভেদরেখাটি নিশ্চিহ্নপ্রায়। অগত্যা হোটেলে ফিরে এলাম। রাত কাটলো আধোঘুমে আধো জাগরণে। ভোর হতেই ছুটলাম সমুদ্রের ধার বরাবর।

কত খুঁজলাম। অজস্র সোনালি বালি নবোদিত সূর্যের আলোয় ঝলমল করতে লাগল। শূন্য হাতে ফিরে এলাম ঘরে। তারপর অনেকবার তীর্থদর্শনে পুরীতে এসেছি। আর যতবার এসেছি, জগন্নাথ দেবকে সাক্ষী রেখে, খ্যাপার মতো খুঁজে বেড়িয়েছি সেই ছোট্টঘড়িটা। বালির মাঝখান থেকে যদি পেয়ে যাই, সেই হারানো মাণিক! শুনেছিলাম, সমুদ্র যা নেয় তা ফিরিয়ে দেয়। আজও কি সেই ফিরে পাবার আশা মনের মধ্যে এতটুকুও ম্লান হয়েছে? ম্লান হয়নি মাষ্টার মশাইয়ের সেই তীক্ষ্ণোজ্জ্বল স্নেহসিক্ত দুটি চোখের অন্তর্ভেদী দৃষ্টি।

সেই সত্তরের দশক পেরিয়ে গেছে কবে কোন্ কালে! তবু খোঁজার নেশা মন থেকে তাড়াতে পেরেছি কি? বিধাতা কোন্ বাঁকে কি ধন দেখাবেন কে বলতে পারে?

আজও তাই খুঁজে চলেছে তৃষাকাতর আমার মন।

সেই কেবল খোঁজার মধ্যেই অনুভব করি তাঁর চিন্তা,তাঁর মনন,তাঁর রসবোধ, তাঁর ছাত্রবাৎসল্য।

কিন্তু এখন তো এসে দাঁড়িয়েছি সকল চাওয়া পাওয়ার বাহিরদেশে, এবার যেতে হবে সাদা কালো, আঁধার আলোর সেই মিলনতীর্থে, সেখানে হয়তো খুঁজে পাব, মানুষের চির অন্বিষ্ট সেই রূপাতীত অরূপরতনকে। উপলব্ধি করবো এ জগৎ মিথ্যা নয়!

“হয়তো ঘুচিবে দুখনিশা,

তৃপ্ত হবে এক প্রেমে জীবনের সর্বপ্রেমতৃষা।”

[চিত্রঋণ- আন্তর্জাল]

[লেখকের অন্য রচনা]

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Amitava Dasgupta
Amitava Dasgupta
4 months ago

খুব খু–ব ভালো লাগলো !!