শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

ভোর চারটে। প্রফেসর দাস স্পিড বাড়ালেন। টকাটক টকাটক। কিবোর্ডে ঝড়। বাইরে আকাশ একটু একটু করে ফর্সা হচ্ছে। টের পান প্রফেসর। এই টের পাওয়াটাই ওনার টিআরপি। সব টের পেয়ে যান, দেখার দরকার পরে না।

লেখালেখির কাজ উনি রাতেই করেন। জানলা দরজা বন্ধ করে। সন্তর্পণে। এমনকি স্ত্রীকে পর্যন্ত আগে ঘুমোতে পাঠিয়ে দেন। কাউকে বিশ্বাস নেই!

এসির একটা ঘ্যানঘ্যানে আওয়াজ ছাড়া আর শব্দ নেই। অথচ মাঝেমাঝেই হালকা ঠুকঠুক করে শব্দ হচ্ছে। দোতলার ফ্ল্যাট ওনার। ওপরে তিনতলার ঘরে কেউ কিছু করছে হয়ত।

কিন্তু এত ভোরে তো কেউ ওঠে না! প্রফেসর একাধারে চমকিত এবং বিস্মিত এবং খানিক ভীত হলেন। কান পেতে শুনলেন। না, ওপরে তো নয়! বসার ঘর থেকে আসছে আওয়াজটা। একমাত্র ছেলে বোর্ডিংএ পড়ে। স্ত্রী এ ঘরেই বিছানায়। এছাড়া আর কেউ নেই ফ্ল্যাটে।

পা টিপে টিপে নিঃশব্দে দরজা খুলে বসার ঘরে উঁকি দিয়ে প্রফেসরের শিরদাঁড়ায় শিহরণ খেলে গেল।

একজন মাঝবয়েসী বিদেশী ভদ্রলোক। নিখুঁত স্যুট-টাই পরা। ব্যাকব্রাশ করা অল্প চুল। পায়ের ওপর পা তুলে সোফায় রাজকীয়ভাবে বসে। মুখে পাইপ। তামাকের দামী গন্ধে ঘরটা ম ম করছে। প্রফেসর বুঝলেন ওই পাইপটাই ঠোকা হচ্ছিল। তারই আওয়াজ পেয়েছেন।

“লেখা হল প্রফেসর?” জলদগম্ভীর কঠিন আওয়াজে ভিরমি খাবার জোগাড়।

“আজ্ঞে, চলছে … স্যর!” ইতস্তত করে স্যরই বললেন প্রফেসর। ভীষণ চেনা চেনা লাগছে। অথচ মনে করতে পারছেন না।

“এ তো চলতে পারে না প্রফেসর। তাই আমাকে আসতেই হল। আরো অনেকেই আসতে চাইছিলেন। তাঁরা সবাই এলে তোমার বেশ অসুবিধা হত।”

এত অবধি বলে থামলেন ভদ্রলোক। সরাসরি তাকালেন। তারপর ধীরে সুস্থে উঠে এগিয়ে এলেন প্রফেসরের দিকে।

ভদ্রলোক এক পা এগিয়ে আসছেন, প্রফেসর এক পা পিছিয়ে যাচ্ছেন। উনি এগোচ্ছেন, ইনি পিছোচ্ছেন।

প্রফেসরের পিঠ ঠেকে গেল শেলফে, আর কাচের ফুলদানীটা সশব্দে আছড়ে পড়ল মার্বেলের মেঝেতে। আর ধাঁ করে মনে পড়ে গেল, ইনি কে।

ভদ্রলোকের তামাকসুবাসিত বরফের মতো নিঃশ্বাস তখন প্রফেসরের মুখের ওপর পড়ছে। ভীষণ ঠান্ডা লেগে কাঁপুনি ধরে যাচ্ছে। প্রফেসর দুই হাত জোর করে প্রায় কেঁদে ফেললেন, “এইবার ছেড়ে দিন স্যর, আর কখনো হবে না!”

ভদ্রলোক গলা টিপে ধরেছেন, প্রফেসরের দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। গোঙানির আওয়াজ হচ্ছে শুধু।

“কি হল? এই যে! আরে, শুনছ? গোঙাচ্ছ কেন?”

প্রফেসরের স্ত্রী দুই হাতে প্রাণপণে ঝাঁকাচ্ছেন তাঁকে। হার্ট অ্যাটাক হল কি না কে জানে!

প্রফেসর অতি কষ্টে চোখ মেলে কোনরকমে বললেন, “ঠিক আছি।”

কি বোর্ডের ওপর মাথা দিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। অনেকগুলো এস পড়ে গেছে লাইন দিয়ে। এসএসএসএসএসএসএসএস…

ধড়ফড় করে উঠে বসলেন প্রফেসর। স্ক্রিনে তখনও খোলা একটা জানালায় “দ্য লেটার”। পাশের জানালায় তাঁর নিজের লেখা। অনুপ্রাণিত আধখানা গল্প।

আর এক জানালায় সেই ভদ্রলোকের স্মিত হাসি পাইপ মুখে। সমারসেট মম! “স্বপ্নই”, বলে প্রফেসর একটু দম নিয়েছেন কি নেন নি, স্ত্রীর উচ্চস্বর কানে এলো, “ফুলদানীটা কি করে ভাঙল?”


অবচেতনের পাড়ে

বেডরুমে ঢুকে শোওয়ার তোড়জোড় করছিল পাঞ্চালী। চোখের কোনায় আন্দাজ করল দরজার বাইরে চট করে সরে গেল কেউ একটা।

নাহ্‌ কেউ নেই।

বাথরুমে যাচ্ছে, মনে হল জানালার ধারে কেউ দাঁড়িয়ে।

নাহ্‌ কেউ নেই।

মনে হল গেট খুলে কেউ ঢুকল।

নাহ্‌ কেউ নেই তো!

ডঃ চাকি পেনটা দুহাতে ধরে বেশ কায়দা করে পাঞ্চালীর দিকে চেয়েছিলেন। চোখে কৌতুক।

“প্রেমে ধাক্কা খেয়েছেন বুঝি?”

“মানে? এ কেমন প্রশ্ন?” পাঞ্চালী ডাক্তারের থেকে এরকম উদ্ভট প্রশ্ন আশা করে নি, সেটা পরিষ্কার।

“আহা! রাগবেন না! আপনার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। কোন ডিপ্রেশন থেকে হতে পারে। তাই একটু আন্দাজ করার চেষ্টা করছিলাম আর কী!”

পাঞ্চালী জবাব দিল না। সুদৃশ্য পেপার ওয়েটটার দিকে এক দৃষ্টে চেয়ে রইল। কষ্টের দলাগুলো অবশ করে দিচ্ছিল সারা শরীর। একটা হাসি মুখ, অপলক চেয়ে থাকা নিঃশব্দের রাত, কথার পরে কথা, আরো কথা, সুখ দুঃখের হিসেবনিকেশ – সব মিথ্যে ছিল? এখনও বিশ্বাস করতে পারে না। হয়ত পারবেও না কোনদিন।

“মিস চৌধুরী!”

“হ্যাঁ!” কেঁপে উঠল পাঞ্চালী। সামলেও নিল। “বলুন।”

ডঃ চাকি পুরোটা লক্ষ্য করেছেন এতক্ষণ। গম্ভীর হয়ে বললেন,

“আপনি লুকিয়ে রাখুন, অসুবিধা নেই। আমি কিন্তু পরিষ্কার বলছি, আপনার কেসটা স্কিৎজোফ্রেনিয়ার দিকে এগোচ্ছে। এই ওষুধগুলো নিয়মিত খাবেন।”

পেন চলল খসখস করে।

“স্কিৎজোফ্রেনিয়া হলে কী হয়?”

“এই যে এখন হ্যালুসিনেশন্স দেখছেন, এরপর ভয়েস শুনতে পাবেন। শুধু আপনিই পাবেন।”

ডঃ চাকির চেম্বার থেকে বেরিয়ে পাঞ্চালী প্রেসক্রিপশনটা ভালো করে দেখে গোল্লা পাকিয়ে সাবধানে ফেলে দিল রাস্তার পাশে।

মিথ্যে হয় কেন? বিশ্বাস করলে ঠকতে হয় কেন? প্রশ্নগুলো মাথা জুড়ে ঘুরপাক খাচ্ছিল, রোজকার মতো, গত ছয় মাসের মতো। দরজার তালা খুলে ঢুকেই যেন মা’কে দেখতে পেল। রান্নাঘরের দিকে গেল। দৌড়! দৌড়! কই? নেই তো মা! মা তো নেই!

একটা শিহরণ খেলে গেল সারা গায়ে পাঞ্চালীর। বেশ ভালো তো! এইসব ছায়ারা থাকলে তো সে কখনো একা হবে না! মনটা খুশি হয়ে গেল। আজ একটা ডেসার্ট বানাবে।

পুড়ে যাচ্ছে শরীর, মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা। ১০২ জ্বর। কাজের দিদি বাড়ি যায় নি। জলপট্টি করছে, ডাক্তারও কল দিয়েছে। এলো বলে। পাঞ্চালীর অফিসের ফোনটা ধরে দিদিই বলে দিয়েছে জ্বরের কথাটা।

এসি চলছে হালকা। পাঞ্চালীর দুচোখের পাশ দিয়ে গরম জল পড়ছে। কিসের যেন অপেক্ষা! কান খাড়া করে আছে! কারোর আওয়াজ পেলেই যেন রুক্ষ জমিতে হঠাৎ প্লাবন আসবে। মনের ভিতরের জ্বরটা যেন ছেড়ে যাবে একেবারে এবার। কই? কই? গলা শুকিয়ে আসে পাঞ্চালীর। জল কোথায়? জল?

“সোনা!”

একটা অস্পষ্ট ডাক। হাতড়ানো থামিয়ে দিল পাঞ্চালী।

“সোনা!”

সেই ডাক! পেয়েছি! পেয়েছি! উন্মাদের মতো উঠে বসল খাটে পাঞ্চালী। হাসছে! যেন পরশপাথর খুঁজে পেয়েছে! কাজের দিদি ভয় পেয়ে গেল একটু হলেও। তার দিকে ঘুরল পাঞ্চালী। শান্ত হয়ে গেল নিমেষে।

“তুমি কিছু শুনতে পাও নি তো?”

দিদি মাথা নাড়ল। না। পাঞ্চালী নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়ল। আর কষ্ট হচ্ছে না। ডাকটা মৃদু ধূপের গন্ধের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে সারা ঘরে।

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.