
‘খুট’ শব্দে জেগে ওঠা মানুষগুলো ঘুম-পাতলা। ঘুম তাদের হজম হয় না ভাল করে। যখন-তখন ঘুম থেকে উঠে মশারি’র মধ্যে চোখ বড় বড় করে বসে রইল, বা ছোট্ট পার্সোনাল টর্চ জ্বালিয়ে সারা ঘর-দোর-জানালা-বারান্দা সার্চ করে এল। এ ছাড়াও নানান অভিব্যক্তি আছে। কে কি কারণে ঘুম-পাতলা হয়ে গেল – সব খবর তো থাকে না সবসময়। সম্পত্তি সংরক্ষণ বিষয়ক পাতলাদের কষ্ট বোধহয় অনেক অনেক গুণ বেশি, কারণ সমস্ত বাস্তববোধ সম্পন্ন মানুষই বোঝে তাদের জ্বালা।

বুঝেশুনে কেউ ‘তোমার অসুবিধা আমি বুঝি’ ব’লে সমব্যথী হয়, কেউ ‘কে বলেছিল অতকিছু জুগিয়ে রাখতে সারা ঘরে, ঠ্যালা সামলাও এবার’ বলে ঈর্ষাকাতর হয়। গল্পটা আসলে একটা একটু-গল্প, গৌরচন্দ্রিকা ঈষৎ দীর্ঘ, কারণ, গৌরবাবু সাড়ে সাতশো স্কোয়ার ফিট ফ্লোর এরিয়া সু’সংরক্ষিত রাখতে গিয়ে খুট শব্দের খোঁজে ঘণ্টা হিসেবে বছরে যে ক’ঘণ্টা ঘুমোন, সে তার জাগরণেরই সামিল। অবশেষে সব পেশাদারী পরামর্শ সব ওষুধ-বিষুধ প্রত্যাখ্যান করতে করতে একদিন ঘুম তাঁকে জানান পাঠাল – তুই বাবা খুট নিয়েই থাক, আমার আর তোকে ফিরিয়ে নেওয়ার পথ জানা নেই।… তখন থেকে তিনি পুরোপুরি ইনসমনিয়ার আওতায় পড়লেন। দিনেরবেলাতেও সারাক্ষণ ঢুলু ঢুলু, কাজকম্মে অনীহা। এমনটা তো চলতে দেওয়া যায় না, গৌরবাবুর স্ত্রী স্বর্ণলতা এবার দায়িত্ব তুলে নিলেন নিজের হাতে, নেমে পড়লেন উদ্ধারকার্য্যে। কারোর কোনো কথা তোয়াক্কা না করে বাড়ির সামনে যাদের তিনি দু’বেলা খেতে দেন, তাদেরই একজন, মাস দুয়েকের নেড়িশিশুকে তার মাকে দেখিয়ে ‘ওকে আমি আমার করে নিলাম’ ব’লে রাস্তা থেকে বুকে তুলে এনে ছেড়ে দিলেন মেঝেয়। বললেন, তোর নাম – খুট। যেন চোখে হারাচ্ছেন এমন করে, যখন তখন ‘খুট আয় খেলবি আয়’, ‘খুট খাবি আয়’, ‘এবার বেড়াতে যাবি আয়’… এসব বলতে থাকলেন সারাদিন। সে টাল-হেঁটে ঘুরে বেড়াতে লাগল ঘরে, আর নামটা চিনে নিল আস্তে আস্তে, আদরে কি না হয়। গৌরবাবু দেখেও না দেখার ভান করতে করতে মাঝেমাঝেই দেখেন খুট তার পা ঘেঁষে হাঁটছে, গা ঘেঁষে বসছে, শুচ্ছে, বারান্দায় খবরের কাগজ পাকিয়ে ছুঁড়ে দিলে এনে দিচ্ছে, পাজামার খুঁট ধ’রে টেনে খেলতে বলছে, রাত্রে তিনি খুট শুনে উঠলে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার সাথে… এক ক্লান্ত মানুষ এমন সব হাতছানিতে উপস্থিতি অগ্রাহ্য ক’রে থাকেন কি ক’রে? তিনিও ক্রমশঃ ‘খুট, আয় শুবি আয়’, ‘খেলবি আয়’, ‘আদর খাবি আয়’, ‘বেড়াতে যাবো, আয়’ হ’য়ে পড়লেন ক’দিনে। সেও ন্যাজ নাড়িয়ে ‘এই-তো-আমি’ ক’রে এসে পড়ে। কিসের এক খুশি যেন ভর করল তাঁকে। খুট শব্দ এবার আশঙ্কা থেকে আদরে প্রতিস্থাপিত হতে থাকল। একটু থেকে একটুতর ফিরে আসছে ঘুম। ঘুম, সে নিজেও বেশ অবাক।

রাত্তিরবেলা খাওয়া সেরে খুট অনেকটা সময় আদরে গ’লে স্বর্ণলতার গা ঘেঁষে শুয়ে সে টিভি দেখে। স্বর্ণলতা বলেন, ‘খুট, এবার যা ঘুম পাড়িয়ে আয় মানুষটাকে’। উঁউ উ ব’লে আপত্তি না আদর কে-জানে-কি জানিয়ে হেলেদুলে ঘুমপাড়ানি খুট নেমে পড়ে সোফা থেকে। এ বাড়ির সবচে’ বড় দায় যে তার।

কাগজের নৌকা
নৌকোটা সুহাসিনীর ঘরের সামনে রাস্তার ঝাঁঝরিতে এসে আটকে জলের স্রোতে ছটফটে দোল খাচ্ছিল। আর কিছুক্ষণ এমন বৃষ্টির ছাঁট আর নর্দমার স্রোতের ধাক্কা খেতে থাকলে ও নৌকা ভিজে নেতিয়ে তলিয়ে যাবে মাটির তলায়। আহা! কে এক ছেলেমানুষ হয়তো কত আশা করে রাস্তার জমা জলে ভাসিয়ে দিয়েছিল। কি ভেবেছিল সে? কোথায় যাবে এই নাও …? সে কথা ভাবতে ভাবতে সেই কত বচ্ছর আগে বিদ্যেধরী পেরিয়ে আসা কিশোরীটিকে মনে পড়ল। তাঁর সে নৌকা সেই যে তাঁকে এ পাড়ে নামিয়ে দিয়ে চ’লে গেল, তারপর থেকে দেখা হওয়া তো দূর, একটা খবর দেওয়া-নেওয়া’র কাগজের ডাক’ও পাঠানো হয় নি তার কাছে। জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে সুহাসিনী কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি হাতে নিয়ে বুকভরা শ্বাস ঠেলে কাকে যেন বলে পাঠালেন, আমি এখনও বেঁচে আছি… তারপর বুড়ো বয়সের ছেলেমানুষী পেরিয়ে অল্প বিষণ্ণ হেসে নিচে তাকিয়ে দেখেন, ছাড় পেয়েছে কাগজের নৌকা… ভেসে যাচ্ছে কোনোমতে জিইয়ে রাখা শরীরটা নিয়ে।


দুটি গল্প দুরকমের। উপভোগ করলাম। সুন্দর লেখনী।
ধন্যবাদ।🌿