
(১)
এতক্ষণে চারপাশটা একটু খালি হওয়াতে কাজে বেশি করে মন দিতে পারলো অর্ণব। চার মাসের প্রজেক্টের অন্তিম পর্ব চলছে। নামী ইন্সুরেন্স কোম্পানির নতুন পেমেন্ট অ্যাপ বানানোর বরাত পেয়েছে অর্ণবদের আই টি কোম্পানি। এই ইন্সুরেন্স কোম্পানির বাজার-চলতি জনপ্রিয় প্রোডাক্টগুলোর প্রিমিয়াম যাতে সহজে খুব নিশ্চিত ভাবে অনলাইনে পেমেন্ট করা যায় তার প্রজেক্ট। সফলভাবে এই পেমেন্ট পোর্টাল চালু হলে বাকি প্রোডাক্টগুলোর জন্য পরের পর্যায়ের কাজও আসতে পারে, অর্ণবদের সংস্থার লাভের বরাত আরো বাড়তে পারার সম্ভাবনা থাকবে।
সকাল থেকে সহকর্মীদের নিজস্ব কথাবার্তার জন্য কাজে মনোসংযোগ করতে পারছিলো না অর্ণব। অধিকাংশদের আগের প্রজেক্ট সবে শেষ হয়েছে, নতুন কাজ আসতে দেরি তাই তারা সবাই ফুরফুরে মেজাজে থাকে আজকাল। অর্ণবদের মতন জনাকয়েক যারা অন্য এই প্রজেক্ট-এ আছে, তাদের কয়েকজনের দম ফেলার সময় নেই এখন। এই মুহূর্তে ফ্লোরের বেশিরভাগ কর্মী লাঞ্চে গেছে, হৈ -হট্টগোল কম। ঠিক সেই মুহূর্তে অর্ণবের সিস্টেমের পাশে রাখা ইন্টারকম বেজে উঠলো, নিশ্চই ওপরওয়ালার ফোন। অর্ণব একটু দ্বিধায় ছিল, সবে ওর কাজে একটু এগোতে পেরেছে, তার মধ্যে এই ফোন।
‘কি রে, লাঞ্চে গেছিলি নাকি, দেরি হলো?’- টিম ম্যানেজার সায়নদার গলা শুনতে পেলো।
‘না সায়নদা’, সিটেই ছিলাম, আসলে একটা কোড চেঞ্জ করছিলাম, তাই ব্যস্ত ছিলাম’, অর্ণব উত্তর দেয়।
‘হ্যাঁ রে, এই সপ্তাহে ফাইনাল ডেলিভারি, হয়ে যাবে তো ঠিক’, সায়নদা’র গলায় উদ্বেগের সুর।
অর্ণব একটু সময় নিলো, একটা ইন্টারনাল ফাইল প্রসেসিংএ সমস্যা হচ্ছে, তার জন্য পেমেন্ট কনফার্মেশন মেসেজ তৈরী হচ্ছে না। সায়নদা’র উপর পুরো দায়িত্ব ইন্সুরেন্স ক্লায়েন্টকে কাজ ডেলিভারি করার। তাই বুঝিয়ে বললো অর্ণব সমস্যাটা, যাতে সায়নদা’র বুঝতে সুবিধা হয়।
‘ঠিক আছে দেখ আরেকটু চেষ্টা করে, ফাইনাল টেস্টিং যাতে এরর-ফ্রি হয়। চাইলে বাকিদের থেকে হেল্প নিতে প্যারিস, কিছু প্রয়োজন হলে কল করিস’, ফোন ছেড়ে দিলো সায়নদা’।
অর্ণবও কাজে ডুবে গেলো, ও বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসে। এই কদিন সিটে বসেই লাঞ্চ করে নিচ্ছে সময় বাঁচাতে। আজ তাই করবে ঠিক করে রেখেছে।

(২)
সন্ধ্যা পার করে রাত নেমেছিল একসময় শহরের বুকে, এল-ই-ডি আলোয় পুরো নগরীকে সাজাবে বলে। সেই রাত আরো গভীর হতে চললো, দিনের কাজ সাঙ্গ করে পাখিদের পর এখন মানুষের ঘরে ফেরার পালা। দুধ-সাদা অ্যাপ-শাটল এসে থামলো সেক্টর ফাইভে, নিউ টাউনে অর্ধেক সওয়ারী উঠেছিল, বাকিরা এখান থেকে উঠবে। কিউ-আর কোড স্ক্যান করে মধুরিমা এসে বসলো পূর্বনির্ধারিত আসনে, নিউ টাউনের সওয়ারী অর্ণব ব্যাগ রেখে দিয়েছিলো যাতে অন্য কেউ স্থান দখল করতে না পারে। গত দুই বছর ধরে এই এক অলিখিত নিয়মের ব্যতিক্রম হয় না সচরাচর ।
‘খুব ক্লান্ত মনে হচ্ছে’ – নিজের আসন গ্রহণ করে মধুরিমা জানতে চায়।
‘কি করে বুঝলি, এই নিভু নিভু আলোতে’ – অর্ণব একটু বিস্মিত হয়।
‘হু হু বাবা, রোজ এক সঙ্গে ফিরি,এটুকু বুঝবো না’ – সপ্রতিভ উত্তর মধুরিমার।
‘ঠিক ধরেছিস, কাজের খুব ধকল চলছে কয়দিন’ – অর্ণব বলে।
‘আগে এটা খা’, শাটল এর অপেক্ষা করতে করতে দু প্লেট মাখন দেওয়া corn সিদ্ধ কিনেছিলো মধুরিমা, তার একটা এগিয়ে দিলো অর্ণবকে।
‘বাঁচালি’, বলে খেতে শুরু করে অর্ণব। দুপুরের পর খাওয়া হয় নি, খিদেতে পেট চোঁ-চোঁ করছিল। খেতে খেতে অর্ণব সব খুলে বলে ওর প্রজেক্টের চাপের কথা।
সব শুনে মধুরিমা বলে, ‘তোকে তো চিনি, হাল ছাড়ার পাবলিক নোস, ঠিক নেমে যাবে প্রজেক্ট, চাপ নিস্ না’, বলে অর্ণবের হাত জড়িয়ে ধরে। বাকি পথটা এই আশ্বাসের চাদর গায়ে জড়িয়ে থাকে অর্ণব, তারপর যে যার গন্তব্যের দিকে চলে যায়। রাত এখন শেষ হয়ে মধ্যরাতের সাজ ধরে, সারাদিনের খতিয়ান জমা পড়ে ক্রমোচলমান ইতিহাসের পাতায়।

(৩)
সায়নদা’ বলেছিলো দিন দুই ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম করে নিতে। অর্ণব ভেবে দেখলো প্রস্তাবটা মন্দ নয়। অফিস যাতায়াতের সময় বাঁচবে, বাড়ীর ‘নীড়ে’ শান্তি উপভোগ করতে করতে কাজের একাগ্রতায় বেশি বজায় থাকবে।
দিন দুই আদাজল খেয়ে লেগে থাকলো অর্ণব। যখন অসহনীয় হতো একটানা কাজ করে, তখন ডায়রি খুলে কিছু একটা লেখার চেষ্টা করতো। এটা ওর অনেকদিনের অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া ধারণা, যখন খুব ওয়ার্কলোড বেড়ে যায়, তখন মানুষ কিছুক্ষনের জন্য যদি শখের জগতে প্রবেশ করে, অনেকটা নির্ভার লাগে। ছোট্ট থেকেই কবিতা লেখার শখ অর্ণবের, সময়-সুযোগ পেলে বসে যায় দু-লাইন লিখতে। দু-লাইন থেকে চার-লাইন, বাড়তে বাড়তে পুরো কবিতা লেখা হয়ে যায় মনের অজান্তে। এরকম নতুন কোনো কবিতা লিখতে পারলেই মেজাজ ঠিক হয়ে যায়, তখন আবার অফিসের কাজে ফিরে আসা সহজ হয়। সেরকম নতুন ঝরঝরে একটা কবিতা লিখে ফেললো অর্ণব কাজের মাঝে।
বাড়ী থেকে কাজ করার সুযোগটা দুভাবেই কাজে লেগে গেলো অর্ণবের। ওদিকে অনেক মাথা খাটিয়ে পেমেন্ট ফাইলের একটা ফরম্যাটিং বিষয়ক গন্ডগোল বার করতে পেরেছে অর্ণব। সেটা ঠিক করে পুরো প্রসেস চালাতে পেরে অবশেষে ফাইনাল পেমেন্টের সাফল্যসূচক বার্তা তৈরী করতে পেরেছে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য নিজের অফিস ইমেইল আই ডি আর মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে দেখে নিয়েছে, দুটোতেই সঠিক বার্তা এসে পৌঁছেছে। আনন্দে নেচে উঠতে ইচ্ছে করে অর্ণবের!
টুং-টুং করে মোবাইলটা বেজে উঠে নতুন বার্তার সংকেত দিলো। একটু অবাক হলো অর্ণব, ওর অফিসের কাজের সব প্রক্রিয়া শেষ, লাস্ট প্রসেসিং এর মেসেজ পেয়েছে যথাসময়ে, মাঝে কয়েকটা অতিরিক্ত অনাবশ্যক মেসেজ জেনারেট হচ্ছিলো ফাইনাল টেস্টিং সংক্রান্ত সেটাও ফিক্স করেছে একটু আগে। আবার কোনো অবাঞ্চিত মেসেজ এলো না তো! দুরুদুরু বুকে মোবাইল খুলতে মুখে হাসি খেলে গেলো অর্ণবের। শহরের নামি প্রকাশনা সংস্থা ‘অবসর’ প্রতি বছরের মতন এবছরও বার্ষিক কবিতা-পাঠের আসর আয়োজন করছে। এদের পত্রিকায় বেশ কয়েকবার লেখা বেরিয়েছিল অর্ণবের আগে, এবারে তাকে বিশেষ আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে প্রতিষ্ঠিত কবিদের পাশাপাশি উদীয়মান কবি হিসেবে স্বরচিত কবিতা-পাঠের। এই শনিবার সেই অনুষ্ঠান হবে, সন্ধ্যা সাতটায়। এবারে সত্যি নেচে উঠলো অর্ণব! পাশের ঘর থেকে মা আর ছোট বোন ছুটে এলো শব্দ পেয়ে। একটা লজ্জা পেলো অর্ণব ওদের আগমনে, তারপর খবরটা বললো তার কবিতা পাঠের আসরে আমন্ত্রণ পাওয়ার। খুশির খবরটা ভাগ করে নিলো ওদের দুজনের সঙ্গে অর্ণব।
আরও একজনকে খবরটা দেওয়ার জন্য ফোন করলো, দুদিন ধরে কথা বলাই হয় নিয়ে যে। জানে মধুরিমা অভিমান করে আছে, দেখা বন্ধ, কথাও হয় নি।
‘বলেন মশাই, কি খবর’, মধুরিমা অভিমানী হলে আপনি-আজ্ঞে করে, বুঝলো অর্ণব তার অনুমান ঠিক।
‘সরি সরি, সময় করে উঠতে পারি নি’, ক্ষমা চেয়ে নিলো অর্ণব।
-‘সেই তো, আপনারা সব ব্যস্ত মানুষ’, মধুরিমার খোঁচা চলতেই থাকে।
‘আরে খবরটা শুনবি তো’, অর্ণব ধৈর্য্য রাখতে পারে না আর।
‘কি খবর, প্রজেক্ট নেমে গেছে তো’, মধুরিমা বিশেষ উৎসাহ দেখায় না।
‘সে তো হয়েছে ঠিকমতন, আরেকটা ভালো খবর আছে। এই শনিবার কবিতা-পাঠের আসরে ‘অবসর’ পত্রিকা আমাকে আমন্ত্রণ করেছে নিজের লেখা কবিতা-পাঠের জন্য’, এক নিঃশ্বাসে বলে অর্ণব।
‘বলিস কি, এতো দারুন খবর’, উত্তেজনায় মধুরিমা আপনি থেকে তুইএ নেমে আসে’, ‘কংগ্রাচুলেশন্স, এর জন্য পরে ট্রিট নেবো কিন্তু’, এই বলে মাধুরিমা রেখে দেয়, অফিসে মিটিঙে আছে বলে বেশি কথা হয় না।
অর্ণবও দ্বিগুন উত্তেজনায় ভাসতে ভাসতে ইমেইল করে প্রজেক্টের সফল টেস্টিং এর খবর প্রমাণ সহ সায়নদা আর পুরো টিমকে পাঠিয়ে দেয়।

(৪)
দুদিন পর শুক্রবার আজ ফুরফুরে মেজাজে অফিস ঢুকলো অর্ণব। কাজের আপডেট গত রাতেই পাঠানো আছে, আজ অফিস এসেছে মূলত সন্ধ্যাবেলায় ক্লায়েন্টকে ডেমো দেওয়ার জন্য।
খবর পেয়ে সায়নদা’ নিজে থেকেই ছুটে এসেছে অর্ণবের সিটে, জড়িয়ে ধরেছে। বললো, ও নিজেও সব প্রসেস চালিয়ে দেখে নিয়েছে পেমেন্ট অ্যাপ ঠিকঠাক চলছে কিনা।
‘অর্ণব, এবারের ডেমো তুই দিবি ক্লায়েন্টকে’, সায়নদা’ বলে।
‘কেন সায়নদা’, একটু অবাক হলো অর্ণব।
‘বলছি’, অর্ণবকে আলাদা ঘেরা মিটিং রুমে নিয়ে যায় সায়নদা’, যেখান থেকে অনলাইনে ডেমো প্রদর্শন করা হবে অডিও-ভিজ্যুয়াল ব্যবস্থার মাধ্যমে।
‘দেখ, পুরো কাজ তুই করেছিস, আমি শুধু লিড করেছি। তুই নিজে ডেমো দিলে ক্লায়েন্ট খুশি হবে। তোর প্রমোশনটা তাহলে আমি সুপারিশ করতে পারবো আমার ওপরওয়ালাকে’, সায়নদা’র আন্তরিকতায় মন ভরে যায় অর্ণবের।
‘ঠিক আছে, আমি দিয়ে দেব ডেমো, আজ সন্ধ্যা সাতটায় তো?’, অর্ণব জানতে চায়।
‘নারে, ওটা কাল শনিবার হবে, আজ ক্লায়েন্ট নিজেরা ব্যস্ত, তোকে বলা হয় নি’, সায়নদা’ বলে।
‘কিন্তু কাল তো শনিবার ..’ – অর্ণবের কথা অসম্পূর্ণ থাকে।
‘জানি, ক্যাব পাঠিয়ে দেব, এলাউন্স পাবি ছুটির দিন অফিস আসার জন্য’, আশ্বস্ত করে সায়নদা।
অর্ণব চুপ থাকে কিছুক্ষন, ক্লায়েন্টকে নিজে থেকে কাল ডেমো দিতে হবে ভেবে খুবই রোমাঞ্চিত লাগছে। আবার সায়নদা’ বলেছে, এর পরে ওর প্রোমোশনের জন্য চেষ্টা করবে, নিশ্চই তাহলে স্যালারি বাড়বে। মা-বোনকে নিয়ে ভালো কোনো জায়গায় বেড়াতে যাবে একটু টাকা জমলে, অনেকদিন ধরে ভেবেছে কথাটা।
কিন্তু কাল আরো একটা কারণে বিশেষ দিন তার জীবনে। বছর শেষে বড় একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শহরে। নিজের লেখা কবিতা পাঠ করবে গুণীজনের সামনে, মাইকে ওর নাম উচ্চারিত হবে। ছোট থেকে সফল কবি হওয়ার ইচ্ছে নিয়ে বড় হয়েছে সে, কাল তার প্রথম স্বীকৃতির সুযোগ। কাজের পদোন্নতি বনাম স্বপ্নপূরণের হাতছানির দোলাচলে ভুগতে থাকে অর্ণব।



জীবন আর জীবিকার চিরকালীন দ্বন্দ্ব। ভাল লাগল।
কাহিনীর শেষে একটি মৃনালবাবু সুলভ treatment আছে যেটা আবার মানিকবাবুর নাপসন্দ ছিল। শেষে পাঠককে একটা পক্ষ নিতে হবে তাই মাথা ঘামানোর ব্যাপার থাকে। কে এখন এই Five minutes delivery র কালবেলায় এত শ্রম দেয়। ভাব, ভাব ভাব প্র্যাকটিস করো।লিখেছ ভালো তাই আমিও লিখলাম।