
কিছু মাটি আর কিছু জলের মধ্যে খুব ভাব হয়ে গেল। জলের ভালো লাগল মাটিকে। মাটিরও জলকে। দুজনে ঠিক করল তারা একসঙ্গে অনন্ত বাঁচবে। কিন্তু কী করে বাঁচবে তারা একসঙ্গে?
মাটি বলল – আয় জল তোকে আমার পেটে পুরে নিই। তাপ্পর দুজনে পুকুর হয়ে যাই। আমরাও বাঁচব। মানুষেরও উপকার হবে। জানিস তো! মানুষ জীবজগতের শ্রেষ্ঠ জীব। তাকে সাহায্য করলে আমাদের বাঁচা শুধু অনন্ত নয়। অনন্যও হবে। জল ভ্রু কুঁচকে রইল। মাটি বলল –পছন্দ হল না আমার কথা?- এই জল বল না …!
জল অন্যমনস্ক। তারপর ধীরে ধীরে বলল — আমি তো শুকিয়ে যাব রে! বাতাস এসে আমায় শুকিয়ে দেবে। একটা খাবলা গর্ত হয়ে পচে মরবি। না তাতে সবুজ ফুটবে। না লোকের গেরস্থালির কাজ হবে।
এইসব শুনে ওপর থেকে খুব চেঁচাল আকাশ :
এই জল ! বোকার ধাড়ি ! সূর্য যেমন তোকে শুকিয়ে ইস্ত্রি করা গেঞ্জি বানিয়ে দেবে আমার মেঘ বৃষ্টি হয়ে তোকে বাড়িয়ে দেবে। তোর বন্ধুর পেট ফের ভরে উঠবে। নে নে – আর দেরী করিস নে। ডবকা পুকুর হয়ে যা এখন। দাঁড়া, একটু বৃষ্টি ফেলি তোর ওপরে।

সেই থেকে দু’বন্ধু পুকুর হল। গাঁয়ের বৌরা জল নেয়। কাপড় কাচে। সংসারের গল্প করে। জল মাটি হাঁ করে মানুষের সংসারের জটিল কথা শোনে। তারপর রাতভোর ফিসফিস করে গল্প করে দুটোয়।
শুধু বিকেলবেলা যখন একটা ছোট্ট মেয়ে পায়ে মল পরে পুকুরপাড়ে ঝুমঝুম দৌড়ে বেড়ায় খুব খুশি লাগে জল মাটির। দুই বন্ধুর তখন তিন হতে মন চায়। জল তো আর স্থলের জীবের পিছে দৌড়োতে পারে না। সে যদি বন্যা হয় তবে। পুকুর তাই কেবল উৎসুক চোখে মেয়েটার খেলা দেখে,নাচ দেখে।

ভরাট পুকুরে আজ সাদা জোছনা। তাও জল কালোই দেখায়। এত ময়লা জমেছে হাজার বৃষ্টি হলেও জলের বমি আসে। মাটিকে বমন করতে নেই। সে শুধু ধারণ করে। তাই পেটের মধ্যে জলকে চেপে ধরে রাখে মাটি। আবর্জনা পুকুরের মৃদু স্রোত আটকে দেয়। দু’ বন্ধু মানুষের বর্জ্যে পাগল হয়ে যায়। কিন্তু কিছুতে মরে না তারা। ওই বাচ্চা মেয়েটাকে দেখার লোভে মরতে চায়ও না তারা।
এই মাটি ! ওই দ্যাখ ! রাতের বেলা পুকরের সিঁড়ি বেয়ে নামতে লেগেছে যে মেয়েটা ! আরে ডাক !ওর মাকে ডাক মাটি। এ মেয়ে তো এখুনি আমার মধ্যে ঢুকে মরে যাবে !— জল কাঁদতে লাগল।
মাটিও বিস্ফারিত তাকিয়ে:
জল তুই তবু বয়ে যেতে পারিস। আমি কেবল ধারণ করতে পারি। ফেলতে পারি নে। কী করি! কী করি আমি! পেট আমার কত বড় হয়ে গেছে রে মানুষের বর্জ্যে ! শিশু কি শেষে আমার দানব পেটে সবার অগোচরে পচে গলে থাকবে! ওরে জল !
মা’টা তো মরা মেয়ের মুখটাও দেখতে পাবে না ! ও জল তুই বরং আমা হতে উপচে যা। তারপর স্রোত হয়ে যা ওর মায়ের কাছে। গিয়ে বল – একটা মাত্তর সন্তান তাও কেন সে মরার জন্য ছেড়ে দেয় !
শেষপর্যন্ত মাটি বা জল কেউ পৌঁছতে পারেনি মেয়েটার মায়ের কাছে।
ঘুমন্ত মা খবর পেল না তার মেয়েটা চলে গেল।
শুধু পরদিন থেকে সবাই দেখল পুকুর শুকোতে শুরু করেছে দ্রুত।
পুকুর যখন শুকনো জমি হয়ে গেল পড়ে রইল মল পরা একটা ছোট্ট কঙ্কাল।
ঠিক যেন কাঠি কাঠি হাত-পা ওয়ালা পুতুলটি –
শুধু পাঁজরের হাড়গুলো বড় স্পষ্ট
চোখের জায়গায় দুটো বড় গর্ত।
কঙ্কালও জমির মতো শুকনো হয়ে গেল।

একদিন বৃষ্টি নামল।
মাটি জানত জল তাকে ছেড়ে থাকতে পারবে না।
বৃষ্টির জলে মাটি গলে গলে বাচ্চা কঙ্কালের চোখের কোটরে ঢুকল।
রোদ ঝলক দিল ভিজে মাটিতে।
কঙ্কালের দুই চোখে দুটো বীজ।
ছোট গাছ হয়ে যাবে মৃত শিশুর চোখ।
জল মাটি হাসল।
তারা আর বর্জ্যপুকুর নয়।
শস্যক্ষেত্র।
ও আমার প্রিয় সন্তানেরা -জগতের সব কঙ্কালের সঙ্গে তোমরা ভাব রেখো। জান তো, কোনো এক কালে তারাও সব খেলত …পড়ত …ফুল তুলত ভোরের বেলা। ছিপ ফেলে পুঁটিও ধরত কত !

