
বাংলাদেশে ছড়ায় অসহযোগ আন্দোলন,
বিলিতি পণ্য ও সরকারি বিদ্যালয় বর্জন।
রবীন্দ্রনাথ করেন না এই নীতি সমর্থন —
দেশোদ্ধারে ব্রত তাঁর পল্লী উন্নয়ন।।
আত্মশক্তি দিয়ে দেশগঠনের কাজ —
এই মর্মে স্বপ্ন তাঁর স্বদেশী সমাজ।।
এ পর্বের আরেক নেতা বিপিন পাল পরে
মতভেদে আন্দোলন হতে যান সরে।।
দেশ জুড়ে নামিল অসহযোগের ঢল
দেশবন্ধু গড়িলেন স্বরাজ্য দল।।

সঙ্গে শিষ্য সুভাষচন্দ্র, যতীন্দ্রমোহন —
কণ্ঠে মন্ত্র :- ইংরেজের কাউন্সিল বর্জন।।
অসহযোগে দেন তিনি নব সার্থকতা
দেখালেন গান্ধী নীতি নয় শেষ কথা।।
একদিকে কাউন্সিলে প্রবেশ করিয়া
দেখালেন সরকারি কাজে বাধা দিয়া।।
অন্যদিকে কলকাতা পৌরসভায়
স্বরাজীরা উন্নয়নকর্ম দেখাল সবায়।।
হিন্দু মুসলিম দুয়ের মধ্যে সাধিতে সম্প্রীতি
দেশবন্ধুর বেঙ্গল প্যাক্ট –অপূর্ব সে কীর্তি।
স্বরাজ্য দলের যবে জয়জয়কার,
কংগ্রেসেও স্বীকৃত রাজনীতি তার,
দেশ চায় তাঁর কাছে পথের সন্ধান —
তখনই ঘটিল হায় তাঁহার প্রয়াণ।।
উদ্বোধিত করি দিয়া বাঙালির প্রাণ
দেশবন্ধু করিলেন মহাপ্রয়াণ ।।
[ ধুয়া:- মরি হায়, হায় রে,…]
এ দশকে বাংলার সাহিত্য-আঙিনায়

উদিলেন নজরুল ধূমকেতু-প্রায় ।।
সৈনিক-কবি তাঁর হাতে অগ্নিবীণ,
গানে কাব্যে উচ্ছ্বসিত মন শঙ্কাহীন।।
ধূমকেতু পত্রিকায় বিদ্রোহী নজরুল
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে ফুটালেন হুল।।
রাজদ্রোহে অভিযুক্ত তাঁর এক কবিতা,
বিদেশি শাসনে ক্লিষ্ট দেশের ছবি তা!
নাম তার ‘আনন্দময়ীর আগমনে’–
কাণ্ড গড়ায় কারাবাস ও সেথায় অনশনে।।
নজরুলের কবিতা আনন্দময়ীর আগমনে’ —
“আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি-চাঁড়াল।
দেবশিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবকদের দিচ্ছে ফাঁসি,
ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী? …
মাদীগুলোর আদি দোষ ঐ অহিংসা বোল নাকি-নাকি
খাঁড়ায় কেটে কর মা বিনাশ নপুংসকের প্রেমের ফাঁকি।
হান্ তরবার, আন মা সমর, অমর হবার মন্ত্র শেখা,
মাদীগুলোয় কর মা পুরুষ, রক্ত দে মা রক্ত দেখা।…” ইত্যাদি।

কত গীতিকার কবি সুরকারগণ
মাতালেন বাঙালির গানের ভুবন।।
দ্বিজেন্দ্র, রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদ,
তাছাড়া ভাস্করপ্রভ রবীন্দ্রনাথ।
শিশু সাহিত্যের ভোজে সাজান সম্ভার
অবনীন্দ্র-দক্ষিণা-উপেন্দ্র-সুকুমার।।
পরশুরাম, ত্রৈলোক্য রচেন সরস সাহিত্য,
বিদ্যাচর্চাতেও মগ্ন বাঙালির চিত্ত।।

ইতিহাসচর্চায় ব্রতী যদুনাথ সরকার,
রাখালদাস, নীহার রায় আর রমেশ মজুমদার।।
বঙ্গভাষা-সাহিত্যের রচি ইতিকথা
দীনেশ ও সুনীতিকুমার লভেন অমরতা।।
দার্শনিক পণ্ডিত কত গবেষক আর –
রামেন্দ্র-ব্রজেন্দ্র-শহিদুল্লাহ-সুকুমার।।
[ ধূয়া – “শুনি আগে কহ আর।…” ]
সাহিত্যরথীরা করেন পত্র সম্পাদন —
ভারতী, মানসী, নব বঙ্গদর্শন।।
প্ৰবাসী এগুলির মধ্যে বিখ্যাত বাংলায়,
দীর্ঘজীবী রামানন্দের সুসম্পাদনায়।।
প্রমথ সবুজপত্র করি সম্পাদন
বাংলা কথ্যভাষার ভিত্তি করিলেন স্থাপন।।
‘কল্লোল’, ‘প্রগতি’, ‘কালিকলম’ – ইত্যাকার
পত্রিকা ঘিরিয়া সৃষ্টি বিদ্রোহী চিন্তার।।
দৈনন্দিন জৈব ক্লেদ, আদিম সম্পর্ক
সাহিত্যের বিষয় কিনা — চলিল বিতর্ক।।
কিছু যুবা সাহিত্যিক বিতর্কের কেন্দ্র–
অচিন্ত্য- শৈলজানন্দ- বুদ্ধদেব- প্রেমেন্দ্র।।

ত্রিশের দশকে হের বাঙালি প্রতিভা
দেখাইছে বিজ্ঞানেতে চমৎকার কিবা!
সত্যেন বসুর অভিনব উদ্ভাবন —
পদার্থবিদ্যার তত্ত্ব ‘বসু-সংখ্যায়ন’।।
প্রশান্ত মহলানবিশ রাশিবিদ একজন
আইএসআই প্রতিষ্ঠান করিলেন পত্তন।।
খ্যাত দুই ধন্বন্তরি চিকিৎসা-বিদ্যায় —
নীলরতন সরকার আর বিধানচন্দ্র রায়।।
[ধূয়া – “আহা বেশ বেশ বেশ…”]
এ দশকে বিপ্লবের কাহিনী অশেষ —
ইতিহাস রচেন বিনয়, বাদল ও দীনেশ।।
রাইটার্স বিল্ডিংয়ের বারান্দা-লড়াইয়ে
অবতীর্ণ তিন বীর যুবা অস্ত্র লয়ে।।
যমালয়ে পাঠাইয়া গোরা কতিপয়ে
নিজ দেহে গুলি করে তাহারা নির্ভয়ে।।
অন্যদিকে চট্টগ্রামে বীর যুবাগণ
ইংরেজের অস্ত্রাগার করিলা লুণ্ঠন।।
এর নেতা সূর্য সেন নিরীহদর্শন ।।
গোরাদের ক্লাবঘরে হানিয়া আঘাত
বীরাঙ্গনা প্রীতিলতা করে প্রাণপাত।।
প্রতিশোধ নিতে আসে ইংরেজের পল্টন,
জালালাবাদ পাহাড়েতে যুদ্ধ সে ভীষণ।।
শহীদ হইল মৃত্যুজয়ী কতজন —
সূর্য সেন করিলেন আত্মসংগোপন।।
ইংরেজ ধরিল তারে কয় বৎসর পরে,
প্রাণ নিল বিচারের প্রহসন করে।।
[ধূয়া:- “মরি হায় হায় রে, মরি হায় হায় হায়!”]
আরেক সংগ্রামী বীর মানবেন্দ্র রায়,
জেলে বসি গড়িলেন দর্শন চিন্তায় —
নব রাষ্ট্রনীতি-তত্ত্ব মানবতন্ত্রবাদ।
সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও বঙ্গ রচিলা সংবাদ।।
শরৎ-সাহিত্যে দ্রোহ চিত্রণের দোষে
‘পথের দাবী’ নিষিদ্ধ হইল রাজরোষে।।
দুই নট উদ্ভাসিত জনচিত্ত জুড়ি —
নৃত্যে উদয়শঙ্কর নাট্যে শিশির ভাদুড়ি।।
সাহিত্যে, চিত্রনে, গানে, নাটকে, ক্রীড়ায়
বাঙালি প্রতিভাদীপ্ত আপন বিভায়।।

মাণিক, বিভূতিভূষণ ও তারাশঙ্কর
কথাসাহিত্যে আঁকেন বিচিত্র নারীনর।।
উপন্যাসে স্নিগ্ধ পল্লী-মাধুর্যের ডালি
নিয়ে এলো বিভূতির ‘পথের পাঁচালী’!
সুধীন্দ্র ও বিষ্ণু রচেন নব ভাব-ছন্দ,
যুগসৃষ্টি করিলেন কবি জীবনানন্দ ।।
চিত্রকলায় নন্দলাল ও তাঁর শিষ্যগণ
ভাস্কর্যে রামকিঙ্কর আনেন নূতন স্পন্দন।।
চিত্রশিল্পে যামিনী রায় স্বতন্ত্র ভাস্বর,
গগনেন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ – এঁরাও অমর ।।
সঙ্গীতে নজরুল, কৃষ্ণচন্দ্র, দিলীপ রায়
শচীনকর্তা, আব্বাসউদ্দিন সবারে মাতায়।।
বরেণ্য বাঙালি ক্রীড়ার নানান শাখায়
শতকের নানা পর্বে উদিল বাংলায়।।
গোষ্ঠ পাল কিংবদন্তি ফুটবলের মাঠে
প্রাচীরের মতো দৃঢ় — কেবা তারে আঁটে।।
এছাড়াও সুঁটে, ছোনে, কিংবা সমাজপতি
ক্রিকেটে কি ফুটবলে কীর্তিমান অতি।।
শক্তি ও শরীরচর্চায় বাঙালি অক্লান্ত
খ্যাতি পান বিষ্ণু, গোবর আর শ্যামাকান্ত।।
[ ধুয়া :- ‘আহা বেশ বেশ বেশ ! আহা বেশ বেশ বেশ!”]
বৈপ্লবিক আন্দোলন দমনের আশে
সরকার যুবাদের পাঠায় কারাবাসে।।
রাজবন্দীর অধিকার করিতে অর্জন
কারাগারে বন্দীদল করে অনশন।।
কারারুদ্ধ বহু যুবা করে অধ্যয়ন,
সেই সূত্রে ছড়াইল মার্কসীয় দর্শন।।
সাম্যবাদের আদর্শে হইয়া আকৃষ্ট
একদল ভাবে, এতেই সমাজের ইষ্ট।।
মুক্তি লভি’ এরা যত হইয়া একত্রিত
কমিউনিস্ট গোষ্ঠী সব করে সংগঠিত।।
বলশেভিক বিপ্লবেতে উৎসাহিত চিত্ত
প্রচারিল সর্বহারার বিশ্বভ্রাতৃত্ব!
[ধূয়া – ‘আহা, বেশ বেশ বেশ!….]
আন্তর্জাতিক সাম্যবাদের নবীন প্রভাবে
এরাও সমাজ বদলের কথা ভাবে,
স্বপ্ন দেখে ধনী-দীনে নাহি রবে ভেদ ।।
ভূপেন দত্ত, সৌম্যেন ঠাকুর, মোজাফফর আহমেদ —
ইত্যাকার নেতাগণ তত্ত্বে-সংগঠনে
কমিউনিস্ট মতবাদ ছড়ান যতনে।।
বলশেভিক জুজুর ভয়ে শঙ্কিত শাসক
ভাবে এরা সকলেই চক্রান্তের নায়ক!
কমিউনিস্ট কর্মীদের শিক্ষা দিতে তারা
করিল মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা খাড়া।।
[ ধুয়া — ধিক, ধিক ধিক – ওরে ধিক, শত ধিক!]

এই ধারা বেয়ে এল নবনাট্যের দল —
কত প্রযোজক – বিজন, শম্ভু ও উৎপল।।
নাট্যচর্চা পৌঁছে দিতে মানুষের দ্বারে
নাট্যকর্মীগণ নিবেদিত একেবারে।।
লোকনাট্যে, পথনাট্যে চলে লোকশিক্ষা —
কত ভাবুক শিল্পী, কত পরীক্ষা নিরীক্ষা।।