
বাংলা অভিধানে দেখছি, ব্যুৎপত্তিগত অর্থে প্রতিবাদ শব্দটি মানে হল, প্রতিকূলবচন, বিরুদ্ধবাদ ৷ শব্দটির মুল হলো, প্রতি + বদ্ ধাতু অ। ইংরেজি অভিধানের ভাষায় প্রতিবাদ বা protest শব্দের মানে এর থেকে আলাদা কিছু নয়। সেখানে বলা হচ্ছে, a statement or action expressing disapproval or bjection. প্রশ্ন হল, এই প্রতিবাদ শব্দটা কি একজন লেখকের একটিমাত্র সংরূপের প্রকাশভঙ্গির বিশিষ্টতা বিষয়ক আলোচনায় প্রয়োগ করা যায়? অর্থাৎ, একজন লেখক, এমন কি তিনি যদি হন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং, নাটকের প্রকাশভঙ্গিতে তিনি প্রচলিত ধারার থেকে যতটাই স্বাতন্ত্র্য আনুন না কেন, তাকে কি প্রতিবাদের মত একটা অভিধা দেওয়া উচিত হবে? এর উত্তরে বলা যেতে পারে, প্রচলিত নাটক রচনাশৈলীর অনুসরণ করেন নি রবীন্দ্রনাথ, অন্তত বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাকে অগ্রাহ্য করে নিজের মতো বিষয় এবং প্রকাশভঙ্গি অনুসারে নাটক রচনা করে গেছেন। একজন শিল্পী এইভাবেই প্রথার বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদকে গড়ে তুলতে পারেন, এ কথা মনে রেখে আমরা রবীন্দ্রনাথকে প্রতিবাদী নাটককারই বলব।
আমরা প্রথমে বুঝে নেবার চেষ্টা করি প্রকাশভঙ্গি বা ফর্ম কাকে বলে ৷ প্রাথমিক অর্থে শব্দটি বলতে বোঝানো হয় কোনো বিষয়ের আকার, তাকে দেখতে কেমন, এবং তার মাপ ইত্যাদি– অর্থাৎ, কোনো একটি বিষয়কে প্রকাশ করার উপাদানগুলির সমাহার। এই সমাহারের পেছনে কাজ করে স্রষ্টার মন, তাঁর পছন্দ অপছন্দের বোধ, তাঁর নির্বাচন, কেমন করে তিনি বিষয়টিকে উপস্থাপিত করবেন তার ভাবনা। বোঝাই যাচ্ছে– কী বলব, অর্থাৎ বিষয় যেমন কীভাবে বলব অর্থাৎ ফর্মকে নিয়ন্ত্রণ করে, তেমনি আবার প্রকাশভঙ্গিও নিয়ন্ত্রণ করে বিষয়কে, কোন্ বিষয় নিয়ে কথা বলব, তা ঠিক করে কেমন করে প্রয়োগ করব তাকে। আর, এ সব কিছুর ওপর কর্তৃত্ব করে লেখকের মন, তিনিই বিষয়ের নির্বাচক, নির্বাচক আবার প্রকাশরীতিরও। Both form and content are inherent in the given object and therefore can not be separated from one another. There is no content in general, but only formed content. ie. content which has a definite form. Similarly there is no pure form without any content. Form always has content.

মনে রাখা দরকার, প্রকাশভঙ্গি একটি সামাজিক প্রক্রিয়া। যে কোনো শিল্প কেমন করে রচিত হবে, সে ভাবনা যুগ যুগ ধরে বিবিধ পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে এক এক সময়ে এক একটা নির্দিষ্ট আকার পায়। সেই আকারটি গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠান, সমাজ স্বীকার করে নেয় তাকে, এবং তার ফলে কোনো শিল্পের সান্নিধ্যে যাওয়ার সময় আমাদের সচেতন বা অবচেতনে থাকে সেই বিশেষ প্রকাশভঙ্গিটি, তাকেই আমরা খোঁজবার চেষ্টা করি৷ যেমন ধরা যাক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমাদের জানিয়ে দেয় বিভিন্ন সংরূপের সংজ্ঞা, মনের মধ্যে এমন একটা মাপকাঠি তৈরি করে দেয় যাতে এই বিশ্বাস জন্মায় যে এই বিশেষ সংরূপ অন্য কোনো প্রকাশরীতি গ্রহণ করতেই পারে না। আবার নতুন সময়ের দাবি এক কালের সেই অনিবার্য প্রকাশভঙ্গিকে বাতিল করে দেয়, তখন নতুন কেউ আসেন, যিনি নিয়ে আসেন তাঁর সময়কে বাজিয়ে তোলার উপযোগী নতুন প্রকাশরীতি, সত্যি সত্যি যদি সময় তাতে সাড়া দেয়, তখন তাকে আবার প্রতিষ্ঠান বা সমাজ গ্রহণ করে নেয়। অর্থাৎ, যে ব্যক্তিস্বাধীনতার বোধ সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে, সেই ব্যক্তিস্বাধীনতা প্রতিফলিত হয় ফর্মের নির্বাচনেও, তার সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক খুব দূরবর্তী নয়৷
বুঝে নেবার চেষ্টা করা যাক, কী কী থাকে নাটকের প্রকাশভঙ্গির মধ্যে। এখানে আমরা সংরূপ এবং গঠন এই শব্দদুটিকে আলাদা করে দেখব। সংরূপ বলতে বোঝাতে চাইছি ফর্মকে, একটি রচনাধারার গড় বৈশিষ্ট্য হল সেই বিশেষ সংরূপ। অন্যদিকে, গঠন বলতে বোঝায় সেই বিশেষ রচনাটির গঠন। Paul M Levitt তাঁর A Structural Approach to the Analysis of Drama “I am restricting the term ‘form’ to mean the ultimate organization, the appearance of the whole, the overall pattern which results from the conjunction of the parts of a play.” আবার পরের পাতায় জানাচ্ছেন, — The process of relations by which the parts are organised into their final form the structure of the play.” নাটকটি পাঠকের কাছে পৌঁছে যায় ঘটনার মধ্যে দিয়ে। সে ঘটনা কেমন করে সংস্থাপিত হচ্ছে, তার বিচার নিশ্চয় প্রকাশভঙ্গির আলোচনায় পড়া উচিত। ঘটনা প্রকাশ করে চরিত্রদের অন্তর ও বহির্জগৎকে, কেমন করে তা সম্ভব হয় তাও থাকা প্রয়োজন আলোচনার আওতায়। ততখানি বিস্তারে যাবার অবকাশ আমাদের হবে না, আমরা শুধু রবীন্দ্রনাটকে প্রকাশরীতির স্বাতন্ত্র্য নিয়ে দু একটি সুত্রের কথাই তুলতে পারব।

প্রথমেই মনে রাখা দরকার, বাংলা নাটক রচনায় রবীন্দ্রনাথের প্রকাশরীতির কোনো উত্তরাধিকারী নেই। তাঁর নাট্যরচনাশৈলী বাংলা থিয়েটার গ্রহণ করে নি, বাংলা নাটক রচনা এবং প্রযোজনার ধারাকে সামগ্রিকভাবে পরিবর্তিত করতে পারেন নি তিনি। প্রভূত ভাবে যাদের দ্বারা সমালোচিত হয়েছেন তাঁদের কথা ধরছি না, কিন্তু প্রশংসা করেছেন যাঁরা, যেমন শম্ভু মিত্র– লক্ষ করবার বিষয়, তাঁরাও নিজেরা নাটক লেখবার সময় রবীন্দ্রনাথের প্রয়োগশৈলীকে অনুসরণ করেন নি। জীবৎকালে প্রধান রবীন্দ্রনাটকগুলি পেশাদার থিয়েটারে প্রায় গৃহীত হয় নি, প্রয়াণের সমকাল বা তার পরে চার বা পাঁচের দশকে রূঢ় এবং ভয়ঙ্কর সমকালীন বাস্তবকে প্রতিফলিত করাই প্রধান লক্ষ ছিল নাট্যজনেদের, রবীন্দ্রনাথকে যে খানিকটা ব্রাত্য করেই রেখেছিলেন তাঁরা, সময়ের প্রেক্ষিতে তাকে খুব অসংগত বলা যাবে না। সময়ের সেই উতরোল ঢেউ স্তিমিত হয়ে এলে মুলত বহুরূপীর আয়োজনে রবীন্দ্রনাটকের গভীর এবং নিয়মিত প্রযোজনার ধারা শুরু হল। পরে অবশ্য বহুরূপীর সেই পতাকা আরো অনেকেই কাঁধে তুলে নিয়েছেন। প্রযোজনার সেই ইতিহাসে আমরা যাব না, প্রসঙ্গটি তুলতে চাইছি একটিই মাত্র কথা বলবার জন্যে, রবীন্দ্রনাথের নাটক যে অনভিনেয় নয়, আম জনতার কাছে না হোক, একটি সংবেদনশীল ভদ্রমন্ডলীর কাছে তার আবেদন আছেই, এ কথা মনে রাখা চাই।

নাটকের ক্ষেত্রে প্রকাশভঙ্গির এই স্বাতন্ত্র্য একেবারে গোড়া থেকে দেখতে পাওয়া যাবে। রবীন্দ্রনাথের উন্মেষ পর্বের কবিতায় বিহারীলালের প্রচুর প্রভাব আছে, উপন্যাসে করুণা এবং বউঠাকুরাণীর হাট পর্যন্ত যথেষ্ট পরিমাণে ছায়া ফেলে রেখেছেন বঙ্কিমচন্দ্র, কিন্তু প্রথম নাটক রুদ্রচন্ড থেকেই রবীন্দ্রনাথ আলাদা। তখন যাঁরা নাটক লিখছেন, বিদেশীদের কথা বাদ দিলেও মধুসুদন, দীনবন্ধু মিত্র, রামনারায়ণ এবং ঘরের মধ্যে স্বয়ং জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, তাঁদের কারুর রচনাভঙ্গি অনুসরণ করলেন না রবীন্দ্রনাথ, এ ভেবে বিস্ময় লাগে৷ অথচ, প্রথাগত নাটকীয়তা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের বোধ যে তৈরি হয় নি সে কথা বলা যাবে না। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতিতে আছে, সরোজিনী নাটকের একটি অংশে তাঁর পরামর্শমত জ্যোতিরিন্দ্রনাথ সংলাপ ছেড়ে একটি গান ব্যবহার করেন, এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যে সেই গানটি রচনা করে দেন রবীন্দ্রনাথ। নাট্যাংশের পক্ষে গানটি অত্যন্ত সুপ্রযুক্ত হয়েছিল, জনপ্রিয়ও হয়েছিল খুব। সেটা ১৮৭৫ সাল, রবীন্দ্রনাথের বয়েস তখন চোদ্দ বছর। ১৮৮১ সালে প্রকাশিত ভগ্নহৃদয়ের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ নাটক আর কবিতার প্রভেদ বোঝাতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ উপমা ব্যবহার করছেন, ‘নাটক ফুলের গাছ। তাহাতে ফুল ফুটে বটে, কিন্তু সেই সঙ্গে মূল, কান্ড, শাখা, পত্র, এমন কি কাঁটাটি পৰ্য্যন্ত থাকা চাই।‘ এই সংজ্ঞা নিয়ে তর্ক উঠতে পারে, কিন্তু নাটক যে কেবলমাত্র সুন্দরকে না দেখিয়ে জীবনের সামগ্রিক রূপ দেখাবার চেষ্টা করে, এমন একটি অভিপ্রায় এর মধ্যে থাকে বেরিয়ে আসছে। সে অভিপ্রায় আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে এরও দু বছর আগে লেখা একটি মন্তব্যে, “বাস্তব ঘটনাই নাটকের প্রাণ, আদর্শ জগৎই কবিতার বিলাসভূমি। যাহা হইয়া থাকে, নাটককারেরা তাহাই লক্ষ্য করেন– যাহা হওয়া উচিত কবিদের চক্ষে তাহাই প্রতিভাত হয়৷’ তা সত্ত্বেও তিনি যে প্রথাগত নাটক লেখার দিকে গেলেন না তার কারণ মনে হয়, নাটকের মধ্যে দিয়ে তিনি ব্যক্তিগত জীবনের কিছু সংকটকে প্রকাশ করার চেষ্টা করছিলেন, যাকে তাঁর নিজের মনে হচ্ছিল অন্য ধরনের অন্তর্নাটকীয়। এই সংকট যে বারবার ফিরে আসছে তাঁর প্রথম দিকের নাটকে, তা বুঝতে পারা যায় কাহিনিবৃত্তের কয়েকটি নির্দিষ্ট ধাঁচাকে অনুসরণ করার সূত্রে। রুদ্রচন্ড, বাল্মীকি প্রতিভা, কালমৃগয়া, প্রকৃতির প্রতিশোধের কেন্দ্রীয় ভাবনা এক, কোনো একজন কঠোর হৃদয় মানুষ, নিজেকে যিনি স্বাভাবিক জীবনযাপনের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছেন, তাঁর জীবনে আসে এক নারী, সে তাঁর কঠোরতাকে ভেতরে ভেতরে গলিয়ে দেয়। অবশেষে কঠোরতা ও বিচ্ছিন্নতা সম্পূর্ণ পরাভূত হয় মানুষটির, তিনি ফিরে আসতে চান ভালবাসাময় স্বাভাবিক জীবনে, একটি মৃত্যুশোক গভীর বেদনার রেখা টেনে দেয় সেই প্রত্যাবর্তনে। মনে রাখা ভাল, কেবলমাত্র উন্মেষ পর্বের পাঁচটি নাটকেই নয়, এই কাহিনিবৃত্ত চলে এসেছে পরবর্তী পরিণত পর্বের নাটকগুলিতেও, রাজা ও রাণী বা বিসর্জন ছাড়িয়ে ১৯২৬ সালে প্রকাশিত রক্তকরবী পর্যন্ত। আসলে, বড় বাড়ির অযোগ্য সন্তান হিসেবে রবীন্দ্রনাথ খানিকটা সংকটে ভুগছিলেন বলে মনে হয়। বাবা তো বটেই, দাদারা অনেকেই অত্যন্ত কৃতী, তার পাশে নিজের জীবনকে বিচ্ছিন্ন ব্যর্থ মনে করার কারণ তো ছিলই। রবীন্দ্রনাথের স্বাধীনতাকামী মন জোড়াসাঁকোর বাড়িতে হাঁপিয়ে উঠছিল, মালতী পুথির একটি কবিতায় তিনি যে কৃষক বালক হবার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করছেন, তা নিতান্ত ভাবালুতা একেই আসে নি৷ কম বয়েসের আবেগে নিজেকে তিনি কাঁটা গাছের সঙ্গে তুলনা করছেন প্রভাত সংগীতের উৎসর্গ কবিতায়, বলছেন,
আমি যেন দাঁড়িয়ে আছি একটা বাবলা গাছের মত,
বড় বড় কাঁটার ভয়ে তফাৎ থাকে লতা যত৷
সকাল হলে মনের সুখে ডালে ডালে ডাকে পাখী,
(আমার) কাঁটা ডালে কেউ ডাকে না চুপ করে তাই দাঁড়িয়ে থাকি!
নেই বা লতা এলো কাছে নেই বা পাখী বসল শাখে,
যদি আমার বুকের কাছে বাবলা ফুলটি ফুটে থাকে! বাতাসেতে দুলে দুলে ছড়িয়ে দেয় রে মিষ্টি হাসি,
কাঁটা জন্ম ভুলে গিয়ে তাই দেখে হরষে ভাসি।
(দ্বিতীয় পর্ব পরবর্তী সংখ্যায়)