শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

এক অলৌকিক প্রতিভার সন্ধানে

ভিনসেন্ট ভ্যান গগ- নামটা শুনলেই গায়ে কেমন একটা শিহরণ জাগে। তিনি যেন সৌরজগৎ থেকে ছিটকে আসা এক ধূমকেতূ, ধূলোমাটির পৃথিবীতে ভুল করে এসে পড়েছিলেন এবং মাত্র ৩৭ বছর বয়সে নিজের পার্থিব জীবনে ইতি টেনে আবার মহাবিশ্বে মিলিয়ে গিয়েছেন। তিনি সারাজীবন এত দূর্ভাগ্যের শিকার হয়েছিলেন, যা কোন গ্রীক ট্রাজেডির নায়ককেও হার মানিয়ে দেয়। ভিনসেন্টের জীবদ্দশায় মানুষ তাঁর বিপুল প্রতিভার দিকে দৃকপাত করেননি। কিন্ত মৃত্যুর পর তাঁর প্রতিভার ছটা সারা পৃথিবীর শিল্পানুরাগী মানুষকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। তিনি মারা যাওয়ার পর পৃথিবী আরো ১৩৪ বার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করেছে। কিন্ত এখনও পর্যন্ত তাঁর ছবি নিলামে উঠলে সবচেয়ে বেশী কাড়াকাড়ি পড়ে যায় এবং সবচেয়ে বেশী দামে বিক্রী হয। ভাগ্যের এমন পরিহাস যে মৃত্যুর পর তাঁর ছবি লক্ষ লক্ষ ডলারে বিক্রী হলেও জীবিত অবস্থায় তাঁকে অশেষ আর্থিক কষ্ট ভোগ করতে হয়। তাঁর দশ বছরের সংক্ষিপ্ত শিল্পীজীবনে তিনি ন’শোর বেশী ছবি আঁকলেও জীবদ্দশায় মাত্র একটি ছবির বিক্রী তিনি দেখে যেতে পেরেছিলেন। তাও শোনা যায় তাঁর চরম হতাশাগ্রস্থ অবস্থায় তাঁকে মানসিকভাবে কিছুটা চাঙ্গা করার উদ্দেশ্যে তাঁর ভাই থিও বকলমে ছবিটি কিনেছিলেন।

প্রথম জীবনে তিনি জীবিকানির্বাহের জন্য কখনও আর্ট ডিলারের কাছে, কখনও বইয়ের দোকানে কাজ করেছেন। মাঝে কিছুদিন স্কুলমাস্টারিও করেছেন। কিন্ত তাঁর অন্তর্মুখী স্বভাব এবং আপোষহীন মনোভাবের জন্য কোথাও তিনি স্থিত হতে পারেন নি। তাঁর সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল তাঁর নিজের মানসিক স্বাস্থ্য। মাঝে মধ্যেই তিনি প্যানিক অ্যাটাক, ডিপ্রেশন, স্কিৎজোফ্রেনিয়া ইত্যাদির শিকার হতেন এবং আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগতেন। তাঁর মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে তাঁর কোন বন্ধু ছিলনা। প্রতিবেশীরা তাঁকে এড়িয়ে চলত, এমনকি নিজের পরিবারেও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা কমে এসেছিল। সেই দিশাহীন এবং নিঃসঙ্গ অবস্থা তাঁকে আধ্যাত্মিক ভাবনার দিকে টেনে নিয়ে যায় এবং সেবার ব্রত নিয়ে তিনি বেলজিয়ামে বরিনেজ নামক কয়লাখনি অঞ্চলে একটি গীর্জার মিশনারী হিসাবে ছয় মাসের চুক্তিতে কাজে যোগদান করেন। সেখানে খনিতে কাজ করা রুগ্ন, ক্লিষ্ট, দুর্দশাগ্রস্থ মানুষদের দেখে তিনি গভীরভাবে ব্যথিত ও বিচলিত হয়ে পড়েন। তাঁর অন্তর এতটাই খাঁটি ছিল যে সরাসরি প্রভু খ্রীষ্টের অনুসরণে তিনি আর্তের সেবায় খনিশ্রমিকদের মধ্যে মিশে তাঁদের একজন হয়ে সেবার কাজ করার চেষ্টা করতেন, যেটা গীর্জার তৎকালীন কর্তৃপক্ষ বাড়াবাড়ি বলে মনে করতেন, কিন্ত ভিনসেন্ট তাঁর বিশ্বাসে অনড় থাকেন। ফলস্বরূপ, ছয় মাস পরে তাঁর চুক্তির আর নবীকরণ হয়না। কিন্ত এখানকার দুর্দশাগ্রস্থ মানুষদের ছেড়ে তিনি বেরোতে পারলেন না। তিনি তাঁর জাগতিক সমস্ত কিছু ত্যাগ করেন, তাঁর সামান্য সঞ্চয় এমনকি জামাকাপড়ও এই অসহায় মানুষদের বিলিয়ে দেন এবং শ্রমিকবস্তির একটি পরিত্যক্ত ঘরে থাকতে আরম্ভ করেন। সেখানে আসবাব, বিছানা কিছুই ছিল না। তিনি খালি মাটিতে শুতেন এবং প্রায়শই অনাহারে কাটাতেন। তাতে তাঁর শরীর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছিল। এর মধ্যে একদিন তাঁর প্রিয় ভাই থিও তাঁর সাথে দেখা করতে এসে দাদার পরণে ছিন্নবস্ত্র, গালে বহুদিনের না কামানো দাড়ি, বহুদিন স্নান না করা মলিন পাংশু চেহারা দেখে প্রচণ্ড ভর্ৎসনা করেন এবং তাঁকে ফিরে যেতে বলেন। কিন্ত ভিনসেন্ট জেদে অনড় থাকেন। এই ঘটনার পরে দুই ভাইয়ের সম্পর্কে কিছুটা চিড় ধরে। তাদের দুজনের মধ্যে যে নিয়মিত পত্রবিনিময় হত, তা দীর্ঘ দশমাস বন্ধ থাকে। ইতিমধ্যে খনিতে একটি বড়সড় দুর্ঘটনা হয় এবং ১২১ জন শ্রমিক নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়। তিনি তখন দিনরাত এক করে আর্তের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। এমনকি তাঁর পরণের কাপড় ছিঁড়ে তিনি আহতদের ব্যান্ডেজ বেঁধে দিতেন। তাঁর আর্তের প্রতি দয়া, সহানুভূতিশীলতা এবং নিঃস্বার্থ সেবায় অভিভূত স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘The Christ of Borinage’. প্রাথমিক সঙ্কট কেটে যাওয়ার পর তাঁর মধ্যে একধরণের আধ্যাত্মিক সঙ্কট তৈরী হয়। ঈশ্বর এবং মানুষের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেও তো কোন বিপর্যয় তিনি রোধ করতে পারলেন না। নিজের সীমাবদ্ধতার উপলব্ধি তাঁর বিশ্বাসের ভিত কিছুটা নড়বড়ে করে দেয়। এরকম মানসিক টানাপোড়েনের মধ্যে একদিন তিনি আনমনে কাগজ পেন্সিল নিয়ে ছবি আঁকা শুরু করেন এবং তাতে নিজেকে কিছুটা ভারমুক্ত বোধ করেন। এভাবে কদিন চলার পর আঁকার নেশা তাঁকে পেয়ে বসে এবং তাঁর ব্যর্থ পথভ্রষ্ট জীবনে তিনি নতুন একটি দিশার সন্ধান পান। ক্রমে ক্রমে তিনি অনুভব করেন যে চিত্রশিল্পী হওয়াই তাঁর মুক্তির একমাত্র পথ ও পরিণতি। সেই অনুভব দৃঢ় হওয়ার পর যাতায়াতের পয়সা না থাকায় তিনি সত্তর মাইল পথ পায়ে হেঁটে বৃষ্টি ও তুষারপাত মাথায় নিয়ে জুল ব্রেটন নামক তৎকালীন একজন খ্যাতনামা ফরাসী শিল্পীর সহকারী হিসাবে কাজ করার উদ্দেশ্যে ফ্রান্স বেলজিয়াম সীমান্তের কাছাকাছি ক্যুরিয়ার্স নামক একটি ছোট শহরে এসে পৌঁছান। কিন্ত সেখানে ব্রেটনের সাথে তাঁর দেখা হয়না। ভগ্ন মনোরথ হয়ে তিনি আবার পায়ে হেঁটে বরিনেজ ফিরে আসেন। কিন্ত তখন তাঁর অন্তর তীব্রভাবে শিল্পচেতনায় জারিত হয়ে আছে, তিনি স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে তাঁকে চিত্রশিল্পী হতে হবে এবং তার জন্য যা করণীয় তিনি তাই করবেন। তাঁর প্রথম কাজ হল বরিনেজ ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়া, যেখানে তিনি তাঁর জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ের প্রস্তূতি নিতে পারবেন। তিনি দশমাস পর থিওকে চিঠি লিখে তাঁর নতুন পরিকল্পনার কথা জানালেন এবং থিও-র পরামর্শে ও আর্থিক সহায়তায় তিনি ব্রাসেলসে এসে সেখানকার আর্ট একাডেমীতে ভর্তি হলেন।

পৃথিবীতে তাঁর একমাত্র বন্ধু এবং আপনজন ছিলেন তাঁর ছোটভাই থিও, যাঁর সঙ্গে তিনি খোলাখুলি নিজের মানসিক পরিস্থিতি ও পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতেন এবং অনেক ক্ষেত্রে তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করতেন। তাঁর পুরো শিল্পীজীবনে আর্থিক দিক থেকেও তিনি থিওর উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিলেন। থিও তাঁর এই স্বপ্নদর্শী, বাস্তবজ্ঞানশূন্য শিশুর মত একগুঁয়ে বড়ভাইটির হাত কোনদিন ছাড়েননি। এমনকি ভিনসেন্টের মৃত্যুর ছয়মাসের মধ্যে যখন থিও মারা যান এবং তাঁর নম্বর দেহ প্যারিসে সমাহিত না করে অ্যাভারে নিয়ে আসা হয়। অ্যাভারের সমাধিতে দাদা ভিনসেন্ট এবং ভাই থিও আজও পাশাপাশি শায়িত।

বরিনেজের দশটি মাস ছাড়া থিও আর ভিনসেন্টের মধ্যে অসংখ্য পত্র বিনিময় হয়েছিল। অসংখ্য রূপকের (metaphor) মাধ্যমে ভিনসেন্ট যেভাবে তাঁর জীবনদর্শন ব্যাখ্যা করেছিলেন, তা উচ্চমার্গের সাহিত্য বলে কিছু গবেষক মনে করেন এবং সেই চিঠিগুলো পত্রসাহিত্যের একটি মূল্যবান সংগ্রহ বলে গণ্য করেন।

যাইহোক, প্রায় দু’বছর পর বরিনেজ ছেড়ে ভিনসেন্ট যখন তাঁর নতুন দিগন্তের উদ্দেশ্য যাত্রা করলেন, ততদিনে তাঁর জীবনে সাতাশটি বসন্ত পেরিয়ে গেছে। পরের চার বছর ছিল তাঁর প্রস্তুতির পর্ব, যে সময়ে তিনি চিত্রশিল্প সম্পর্কে নিজের জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়ানোর কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তারপর ব্রাশের স্ট্রোকের উপর নিয়ন্ত্রণ এলে তিনি তেলরঙে কাজ করা শুরু করেন।

পেইন্টিং এর জগতে তখন Realism এর যুগ পেরিয়ে Impressionism এর যুগ চলছে। ক্লড মঁনে, পল সেজানে, পিয়ের রেনোঁয়া, এডওয়ার্ড মানে, এডগার ডেগা ইত্যাদিরা চিত্রশিল্পের নতুন ফর্ম নিয়ে কাজ করছেন। তারপর পরবর্তীকালের ডাকসাইটে শিল্পী পল গ্যঁগা, জর্জ সুয়ার্ত, ক্যামিল পিসারো তাঁরাও প্যারিসে এসে আরো নতুন ভাবনাচিন্তার ইন্ধন যোগালেন। এখানেই ভিনসেন্ট সবার সাথে পরিচিত হন। তাঁরা ছবিতে নতুন আঙ্গিক নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন, অন্যদের সাথে তর্কবিতর্কের মাধ্যমে নিজেদের আরো ধারালো করেন, একসাথে শুঁড়িখানায় অ্যাবসিন্থে খেতে খেতে হুল্লোড় করেন, কেউ কেউ নিয়মিত বেশ্যাবাড়ি যান। সবকিছুর মধ্যেই তাঁদের নিরলস শিল্পসাধনা চলতে থাকে এবং তাঁদের দ্বারা চিত্রশিল্পে Post Impressionism যুগের সূচনা হয়।

এরপর পুরোদমে ভিনসেন্ট তাঁর শিল্পসাধনায় নিমগ্ন হয়ে পড়েন। চরিত্রগতভাবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত অধৈর্য প্রকৃতির মানুষ। যা করতে চান সেটা দ্রুত না করতে না পারলে তাঁর খুব মানসিক চাপ বেড়ে যেত। কিন্ত নিজের কোনরকম রোজগার না থাকায় যে গতিতে তিনি কাজ করতে চান সেটা সম্ভব হয়না, অর্থের যোগান সেখানে বেশ কিছুটা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। থিওর পক্ষে প্যারিসের মত ব্যয়বহুল শহরে তাঁর বড়ভাইটির সম্পূর্ণ ভরণপোষণের খরচ চালানোর পর ঘন ঘন ক্যানভাস, রঙ ইত্যাদির পয়সা যোগানো সম্ভব হয়না। তখন পয়সা বাঁচানো এবং নির্জনে শিল্পসাধনা করার উদ্দেশ্যে প্যারিস ছেড়ে ভিনসেন্ট দক্ষিণ ফ্রান্সের আর্ল নামক একটি ছোট কোলাহলমুক্ত গ্রামে এসে থাকতে শুরু করেন।


আর্লের নির্জনতা, পরিশ্রমী সাদাসিধে মানুষজন, রোন নদীতীর, বিস্তৃত গমের ক্ষেত তাঁর ছবি আঁকার প্রচুর উপাদান যোগায় এবং তাঁর কাজের উৎসাহ বাড়িয়ে তোলে। গ্রামের মানুষদের বয়ান অনুযায়ী তাঁরা প্রতিদিন একজন পাগল শিল্পীকে কাঁধে ইজেল ও আঁকার সরঞ্জাম নিয়ে উদভ্রান্তর মত রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে দেখতেন। গনগনে রোদের মধ্যে কখনও নদীর ধারে, কখনও গমক্ষেতের পাশে এবং গ্রামের নানা প্রান্তরে বসে তাঁকে ছবি আঁকতে দেখা যেত। আর্লে বসবাসের পনের মাস সময়টা ভিনসেন্টের জীবনের সবচেয়ে ঘটনাবহুল অধ্যায়। এখানে তিনি আনুমানিক তিনশোর উপর পেন্টিং এবং ড্রয়িং করেছেন। তিনি মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন সমসাময়িক আরো কয়েকজন শিল্পী আর্লে চলে আসুক এবং একটি আর্ট কমিউনিটি গড়ে তাঁরা এখানেই একসাথে কাজ করুক। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে পল গ্যঁগা আর্লে চলে আসেন এবং ভিনসেন্টের সাথে একই বাড়িতে, যেটা আর্টের ইতিহাসে The Yellow House নামে বিখ্যাত হয়ে আছে, সেখানে থাকতে শুরু করেন। কিন্ত কিছুদিনের মধ্যেই তাঁদের মনোমালিন্য শুরু হয়। তাতে ভিনসেন্টের আবার মানসিক স্থিতি বিঘ্নিত হয় এবং অসংলগ্ন আচরণ বেড়ে যায়। তেষট্টি দিনের এই অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি এক চরম অপ্রীতিকর ঘটনার মধ্য দিয়ে ঘটে। একদিন দুজনের মধ্যে তীব্র বাকবিতন্ডার মাঝে ভিনসেন্ট কান্ডজ্ঞান হারিয়ে নিজের বাঁ কানের অনেকটা কেটে ফেলেন এবং সেটি একটি কাপড়ে মুড়ে আর্লের পতিতালয়ের একজন পরিচিত পতিতাকে উপহার দিতে যান এবং শোনা যায় এমন একটি বীভৎস দৃশ্য দেখে মেয়েটি জ্ঞান হারান। তারপর ভিনসেন্টের শুশ্রুসার জন্য তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এই ঘটনায় যারপরনাই ভীত হয়ে গ্যঁগা পরদিনই প্যারিসে ফিরে যান। পনের দিন পর হাসপাতাল থেকে ফেরার পর ভিনসেন্ট আবার নিজের ছন্দে ফেরার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। বারবার প্যানিক অ্যাটাক হতে থাকে। তখন তিনি আর্লের পাট চুকিয়ে স্বেচ্ছায় সেন্ট রেমির মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হন।

সেন্ট রেমি হাসপাতালে তিনি এক বছরকাল অতিবাহিত করেন এবং এই পর্বে প্রায় দেড়শ ছবি আঁকেন, যার মধ্যে বেশ কিছু কালজয়ী ছবিও আছে। তাঁর বিখ্যাত The Starry Night ছবিটিও এই পর্বে আঁকা। তাঁর হাসপাতালের জানলার বাইরে রোন নদীর উপরে শেষ রাত এবং ঊষার সন্ধিক্ষণে তারাভরা আকাশটি এই চিত্রে ধরা হয়েছে। এটিকে Post Impressionism যুগের একটি অন্যতম সেরা শিল্পকর্ম হিসাবে ধরা হয়।

১৮৯০ সালের মে মাসে তিনি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান এবং প্যারিসের কাছাকাছি অ্যাভার নামক ছোট একটি জনপদে থাকতে শুরু করেন। কিন্ত তখন তিনি তাঁর জীবনের উপর তিতিবিরক্ত, হতাশার অন্ধকার থেকে কিছুতেই বেরোতে পারছেন না। মাঝেমধ্যেই আত্মহত্যার চিন্তা মাথায় ঘোরাফেরা করে। তারপর জুলাই মাসের ২৬ তারিখে চরম হতাশাগ্রস্থ অবস্থায় তিনি নিজের বুকে গুলি করেন। দুদিন হাসপাতালে থাকার পর অবশেষে ২৯শে জুলাই তাঁর বিক্ষুব্ধ জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।

তাঁর মৃত্যুর খবর প্যারিসের একটিমাত্র সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে তাঁর ভাই থিও’র স্ত্রী জো ভ্যান গগ বনগার ভিনসেন্টের সৃষ্টির সাথে বৃহত্তর পৃথিবীর পরিচয় ঘটানোর জন্য তাঁর আঁকা ছবির কয়েকটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেন এবং থিওকে লেখা ভিনসেন্টের পত্রগুচ্ছ প্রকাশ করেন। তাঁর ছবিতে বিষয় নির্বাচন ও রঙের ব্যবহারে অভিনবত্ব দেখে বোদ্ধারা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যান। ভাইকে লেখা চিঠিতে তাঁর জীবনদর্শন, প্রকৃতি ও মানুষের প্রতি গভীর ভালবাসা, আজীবন মানসিক ও আর্থিক সঙ্কটের করুণ কাহিনী সারা বিশ্বের মানুষকে অভিভূত করে। তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ার পর যেখানে যেখানে ভিনসেন্টের পদচিহ্ন পড়েছিল যেমন আর্ল, অ্যাভার, সেন্ট রেমি হাসপাতাল, বরিনেজ প্রতিটি জায়গা সারা বিশ্বের শিল্প গবেষক এবং অনুরাগীদের তীর্থস্থান হয়ে আছে। জীবন তাঁকে নির্মমভাবে সাফল্যের স্বাদ থেকে বার বার বঞ্চিত করেছে, কিন্ত মহাকাল তাঁকে যে জয়মাল্য পরিয়েছে, তার কোন দ্বিতীয় উদাহরণ শিল্পকলার ইতিহাসে নেই।

তথ্যসূত্রঃ
Lust for Life, by Irving Stone
The Yellow House, by Martin Gayford
Different sites of Internet.

একটি ব্যাক্তিগত নিবেদন –
এই মহান শিল্পীর জীবন এত ঘটনাবহুল ও বৈচিত্র্যময় ছিল, যা কয়েকশ শব্দের বাঁধুনিতে বেঁধে রাখা খুবই দুষ্কর। তাই তাঁর জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে অবলম্বন করে তাঁর একটা ধারাবাহিক জীবনচিত্র আঁকার অক্ষম চেষ্টা করেছি। অনেক আগে পড়া দুটি বইরের স্মৃতি এবং ইন্টারনেটে তথ্য ঘেঁটে এই লেখার মালমশলা যোগাড় করা হয়েছে। ইন্টারনেটে তথ্য ঘাঁটতে গিয়ে অনেকসময় কিছু কিছু ঘটনার সময়কাল এবং তথ্যের ফারাক লক্ষ্য করেছি, সেক্ষেত্রে নিজের বিবেচনায় যেটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সঠিক বলে মনে হয়েছে, সেটাই এখানে উল্লেখ করেছি।
কলেজ পাশ এবং চাকরিজীবনের মাঝে Irving Stone এর লেখা ভিনসেন্ট ভ্যান গগের জীবনী ‘Lust for Life’ পড়ে সম্মোহিত হয়ে গিয়েছিলাম। তখন থেকেই মনে মনে একটা স্বপ্ন ছিল যদি কোনদিন সুযোগ ও সঙ্গতি আসে তাহলে এই ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রতিভার কিছু ওরিজিনাল ছবি কোনদিন দেখতে যাব। সম্প্রতি আমার দীর্ঘদিন ধরে লালিত সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। প্যারিসের অরসে মিউজিয়ামে তাঁর আঁকা কিছু মূল ছবি দেখে আমার জীবন সার্থক করেছি। সেখানে প্রদর্শিত কিছু ছবির ফটো এই পোস্টের সাথে যোগ করছি।

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
শিবপ্রসাদ নিয়োগী
শিবপ্রসাদ নিয়োগী
4 months ago

ভিনসেন্ট ভ্যান গঁগ- এর জীবন নিয়ে ভাসাভাসা বা অনেকটা জানেন, অনেকেই। এই লেখাটিতে ব্যক্তিজীবন ও শিল্পীজীবনকে পাশাপাশি রেখে আলোচনা করায় আমার মত সাধারণ পাঠকের খুব সুবিধা হয়েছে। প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ তথ্যই এসেছে সহজ ভাবে। চলতি ইন্টেলেকচুয়ালদের মত লেখা নয় বলে ভিনসেণ্ট বেঁচে গেলেন। আমরাও।

যারা ভিনসেণ্ট ভ্যান গঁগ নিয়ে আরও চর্চা করতে চান এই ছোট্ট লেখাটি তাদের রেফারেন্স হিসেবে কাজে লাগবে।

শেষে বলব লেখক মহাশয় নিজের চোখে কিছু অরিজিনাল ভ্যান গঁগ দেখে এসে এটা লিখেছেন। আমার ব্যক্তিগত ঈর্ষা তার দিকে ধাবিত হোক।

Debashis Chakrabarty
Debashis Chakrabarty
3 months ago

লাস্ট ফর লাইফ এমন বই যে বারবার তার সামনে যেতে হয়। এই সংক্ষিপ্ত লেখাতে ভিনসেন্টের বিশাল আকাশকে প্রতিফলিত হতে দেখে গভীর আনন্দ অনুভব করলাম।