
এই ভয়াবহ সাম্প্রতিকতায় তিনি কতটুকু আছেন? কতটুকু থাকতে পারেন একজন গহনমগ্নতার কবি?
কখনো কখনো সময়ই কবিতার আশ্রয় নিশ্চয়ই। সত্যিই কি আশ্রয়? না,দায়িত্ব? সব দায়বদ্ধতা কি শেষপর্যন্ত সবার কাছে অবলম্বন হয়ে উঠতে পারে? সাময়িকতার ঝড় সামলে, দৈনন্দিনতার সহজ আর্তিগুলো ছুঁয়ে থেকেও ব্যক্তি বা সমাজ-মানবিকতার চিরকালীন সংবেদ গুলোই কি শেষপর্যন্ত কবিতার অন্বিষ্ট নয়? হয়তো উত্তরসন্ধান এত সহজ নয়। এত সরল নয় কবিতা ও সাময়িকতার সম্পর্ক!
জৈবিক জীবনে কখনো অতিমারীর ভয়াল থাবা, কখনো খণ্ডজাতিসত্তার আইডেন্টিটি ক্রাইসিস থেকে উঠে আসা জেনোসাইডের ভয়ঙ্কর ভ্রুকুটি, যেন গোটা পৃথিবীতে মানুষের দায়বদ্ধতা ও বন্ধনগুলোর অগ্নিপরীক্ষা নিয়েই চলেছে। বহুক্ষেত্রে আলো দেখছে পৃথিবী। তেমনি অক্ষমতায়, অতি- স্বার্থবোধে, অমানবিকতায়,অসহায়তায় প্রকৃতি আর প্রবৃত্তির নতুন পরীক্ষায় বহুক্ষেত্রেই যেন সভ্যতা হেরে যাচ্ছে। কেন? আসল মড়ক কি বরাবরই ছিল ভেতরে ভেতরে? নতুন প্রকরণে প্রকৃতি সেটাকে নগ্ন করে দিয়েছে শুধু? তাই যদি হয়, ঠিক এই জায়গাটায় সাম্প্রতিকতার প্রেক্ষাপটে তিনি কি প্রাসঙ্গিক নন?

আসল মড়ক কি অন্যত্র? যখন সময়ের প্রত্যেকটা প্রত্যঙ্গে চাপ চাপ অন্ধকার, চৈতন্যের মড়ক আর ক্ষয়ের সংক্রমণে বিপর্যস্ত নন্দন ও সংবেদের পৃথিবী, তখন মৃত্যুদিনে কবির স্মরণ হোক একটু অন্য আলোয়।
যুক্তির গ্রন্থনা, তথ্যের মোহময়ী সমাবেশ আর উচ্চারণের মায়াবী স্পষ্টতা, এমনকি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিশ্ব– সবই আসলে কী ভীষণ প্রতারক! তাই কি কবির পরাভাষায় এত গহনডুবের আমন্ত্রণ সর্বক্ষণ ?
“আস্তাবলের ঘ্রাণ ভেসে আসে এক ভিড় রাত্রির হাওয়ায়
বিষণ্ণ খড়ের শব্দ ঝরে পড়ে ইস্পাতের কলে”
মনে করে দেখুন, এর ঠিক আগেই দৃশ্যবাস্তবের জরায়ু থেকে জন্ম নিয়েছিল এক পরানন্দনের পৃথিবী! ” কার্তিকের জ্যোৎস্নার” মায়াবী প্রান্তর অতিক্রম করেছিল ” মহীনের ঘোড়াগুলি”! খণ্ডকালের নাগপাশকে গৌণ করে “প্রস্তরযুগের সব ঘোড়াগুলো ” ছুঁয়ে ফেলেছিল মহাকালকে! কীভাবে? দৃশ্যবাস্তবের স্পষ্টতা অার শব্দার্থের দ্যোতনাকে অতিক্রম করে নিশ্চয়ই।
সমস্ত দৃশ্যবাস্তবতা ও যৌক্তিকতার অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ কি যান্ত্রিকতা? বাস্তবের স্পষ্টতায় সেখানে যন্ত্রের কোলাহল! খড়শব্দের বিষণ্ণতাতে যেন সময়েরই নিরুচ্চার কান্না!
আবার সময়ের হৃদস্পন্দন ধরতে একটু অন্য চলনওতো ছিল!
একাকীত্বই যাঁর স্বাচ্ছন্দ্যের নিসর্গ, তিনিও যেন উৎকন্ঠিত সময়ের ব্যবচ্ছেদে—
“যতই শান্তিতে স্থির হয়ে যেতে যেতে চাই,
কোথাও আঘাত ছাড়া-তবুও আঘাত ছাড়া
অগ্রসর সূর্যালোক নেই।”
আঘাতের নির্দিষ্ট দিশা হয়তো নেই। নেই বলেই ঐ সংবেদী দ্বিধায় কেউ কারুকৃতির নন্দন খুঁজবেন হয়তো। কেউ হেগেল থেকে মার্কস- -বিবর্তিত ডায়ালেকটিকসের বিবর্তন খুঁজবেন। কেউ “অগ্রসর সূর্যালোক” – এ গতির অন্তিম উৎসারণে ক্লিশে হয়ে যাওয়া শব্দবন্ধ “জীবনের জয়গান” কে ধরে ফেলবেন অত্যাধুনিক অর্থবলয়ে। কিন্তু একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়াই যাবে। কবিতা পচাগলা সময়ের অলংকার নয়। বরং অন্ধকার থেকে উত্তরণের পথে এক অনির্বাণ ধ্রুবতারা ।
অথবা ধরুন-
“তবুও নক্ষত্র নদী সূর্য নারী সোনার ফসল
মিথ্যে নয়।
মানুষের কাছ থেকে মানবের হৃদয়ের বিবর্ণতা
ভয়
শেষ হবে-”
কোথাও অবরুদ্ধ আবেগের মুষ্টিবদ্ধ উৎক্ষেপন নেই। আছে মানুষ-ভালোবাসায় ঋদ্ধ এক স্থির প্রত্যয় আর সংযত উচ্চারণ ।

অথবা একটু অন্য বয়ন-
“ইতিহাসের ব্যাপক অবসাদের সময় এখন,তবু
নরনারীর ভিড়
নব নবীন প্রাকসাধনার-নিজের মনের সচল
পৃথিবীকে
ক্রেমলিনে লণ্ডনে দেখে তবুও তারা আরো
নতুন অমল পৃথিবীর। ”
অনমনীয় মতবাদে দীক্ষিত না হয়েও মানবিক আদর্শের অমল ভোরই এ কবিতায় তাঁর অন্বিষ্ট। পচনে-ঋদ্ধিতে, যন্ত্রণায়- আনন্দে , অস্থিরতা-প্রশান্তিতে , হিরণ্ময় সূর্য থেকে প্রক্ষিপ্ত রাত্রিতে এক বিন্দুতে স্থির থাকা তাঁর পক্ষে অসম্ভব ছিল। তবু তিনি মানবপ্রেমী। অন্তরাশ্রয়ী(introvert) হয়েও।
নিছক নক্ষত্রপ্রেম, হৈমন্তিক বিষণ্ণতা , তথাকথিত বসন্তক্লান্তি বা সিন্ধুসারসের অনিঃশেষ উড়ানের থেকে তাঁর চেতন- অচেতনের নির্মাণ অনেক বেশী বাঙ্ময়। মগ্নচৈতন্যের সেইসব নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের অন্তর্বতী অস্পষ্টতা আজও একাকী পাঠকের প্রগাঢ় স্পন্দনের একান্ত পরিসর। বোধহয় এই প্রগলভ গোটা পৃথিবীকে ছুটি দিয়ে শুধু তাঁর কবিতাকে সঙ্গে নিয়েই এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপে স্বেচ্ছা নির্বাসনে চলে যাওয়া যায় অনায়াসে। পৃথিবীর অন্ধকার ও যন্ত্রণা উপেক্ষা না করেও।
কবিতায় কবির বিবর্তিত প্রস্বরই কবির জীবনবোধ, এটুকু বিশ্বাস করলে বলতেই হয় তাঁর ব্যক্তিজীবনের প্রাতিভাসিক উৎকেন্দ্রিকতা তাঁর কবিতার স্পন্দন থেকে ভিন্ন কম্পাঙ্কের নয়। তাঁর কবিতার এটাও সার্থকতা এই যে এই একাকীত্ব আর দ্বৈপায়নিক প্রশান্তির আবহ তিনি পাঠকমনেও সঞ্চারিত করতে পেরেছেন।
হে বিকৃত ও বিক্রীত সময়! শৌখিন জড়ত্ব অথবা নেতির চটক —- একমাত্রিক মগ্নতায় নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ থেকে উত্তরণ খোঁজো। মাটির যন্ত্রণাকে উপেক্ষা করে শুধুই নন্দন কবিতার অন্বিষ্ট নয় । যেমন সবাইকে নস্যাৎ করে তথাকথিত প্রান্তিকতার সাধনায় শুধু অপভাষার যথেচ্ছ প্রয়োগও মাটিলগ্ন কবিতার একমাত্র স্পন্দন নয়। অবরুদ্ধ যন্ত্রণার সব মানুষই আসলে ভিন্নতর অর্থে প্রান্তিক! বিষণ্ণ ও একাকী সেই যন্ত্রণার যথার্থ সংবেদও কবিতার আর্তি। সেইজন্যই, সেইজন্যও আজও তিনি প্রাসঙ্গিক। এই ভয়ংকর দুঃসময়েও!
এসো, সময়! আরো একটু আলোকিত হই তাঁর কবিতার আশ্রয়ে ও প্রশ্রয়ে।

