শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা


ঐ তো কদমতলা। বাজার, হাট, মন্দির স্কুল, খেলার মাঠ।
ভোলা ময়রার ল্যাংচার দোকান, পাঁচুর তেলেভাজার দোকান পেরোলেই মাকড়চন্ডীর মন্দির। সামনের বকুল গাছের কোল ঘেঁষে সিমেন্টের বাঁধানো তেল চকচকে লাল রক, বিকেলে গ্রামের বয়ঃজ্যেষ্ঠরা এখানেই বসেন।
ঝুপ করে সন্ধ্যা নামলেই গুটি গুটি পায়ে ঘরে ফেরা।
ও’পাশের রাস্তাটা কুলির পথ। সামনের ঘন বাঁশ ঝাড়ের তলা দিয়ে যেখানে মধ্যে গগনেও সূর্যের আলো মাটি স্পর্শ করে না। সে পথ বেয়ে সোজা গেলেই ষষ্ঠীসদন। বাড়িতে ঢোকার মুখে ঠাকুরদালান, ধান কাটার সময়ে এখানে খড় জমা করে রাখা হোত সংলগ্ন জমিতে। এখনও কাঁচা খড়ের সোঁদা গন্ধ মেখে বসে আছে। ঠাকুর দালানের পাসেই বহু প্রার্চীন কুঁয়ো স্নানের সময় তার শীতল জলের স্পর্শে মন জুড়িয়ে যেত। বড় ফটক পার হয়ে ফুলের বাগান পেরিয়ে চোখ চলে যায় স্থলপদ্ম গাছটায়।

বেলা বাড়তো, গোলাপি রঙ হতো গাঢ়, পরে টকটকে লাল। কোথায় সে গাছ? এই তো ছিল। ফাঁকা হলো কখন?
সামনে খিলান আর মোটা মোটা থামওয়ালা বাড়ির কড়ি বরগার পরতে পরতে পায়রার বকবকম। কই এমন তো ছিল না।
এই বাড়িতেও ছিল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস খ্যাত ‘দক্ষিণের বারান্দা’। অবসর মূহুর্তে সেখানে ইজিচেয়ারে দাদামশাইয়ের গভীর মনসংযোগে বইয়ের পাতা উল্টানো।
মেজদাদুর খড়মের শব্দ কোথায় ?
আকাশে পেঁজা তুলোর মত মেঘের দলের ইতিউতি উড়ে বেরানো, বর্ষা শেষে টইটুম্বুর দীঘির গভীর কাজলা জলে শালুকের ভেসে বেড়ানো, মাঠের ধারে আলের উপর হাওয়ায় কাশ ফুলের দুলুনি আগমনীর আগমনের জানান দিত।


রাত্রের গভীর নিস্তদ্ধতাকে খান খান করে শুধু টানা ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক। সেই নিস্তদ্ধতায় গভীর মনঃসংযোগে রেড়ীর তেলের লম্ফের আলোয় মৃন্ময়ীর চক্ষুদান পর্বে ব্রতী শিল্পী। অন্যদিকে প্রকান্ড দালানের খিলান ও কড়িবরগার নিচে বৃহদাকার থামের আড়াল থেকে গর্ভধারীণীর দু’চোখ ভরে দেখা। শেষে গর্জন তেলের প্রলেপে প্রতিমার অপরূপ সৌন্দর্যের অঙ্গসজ্জা। পুজোয় নতুন পোশাক ছাড়াও প্রত্যেকের একটা করে নতুন গামছা ও গন্ধ তেল মেখে ষষ্ঠীর দিন থেকে নতুন পুকুরে স্নান বাড়ির ছোটোদের অন্যতম আকর্ষণ। ঠাকুর দালান থেকে সুমিষ্ট সুললিত মন্ত্র ও চন্ডীপাঠের উচ্চকিত কন্ঠস্বরে বাড়ির অলিন্দ থেকে অলিন্দে প্রতিধ্বনিত হোত। পুজোর কয়েকদিন আগে থেকে ভিয়েন বসত। সে কত রকমের কত ধরনের যে মিষ্টান্ন ও নোনতা! অপূর্ব সে সব খাবারের স্বাদ। তার মনমাতানো গন্ধে সারা বাড়ি ম ম করতো। পুজোর সে কদিনের ব্যস্ততার মাঝখানে উঠোনে জমত যাত্রাপালার আসর। সেবার এই পুজোয় উপস্থিত হয়েছিলেন অনেক গুণীজন। এসেছিলেন রসরাজ অমৃতলাল বসু। এসেছিলেন অবন ঠাকুর। কথা হচ্ছিল সেই আনন্দের দিনগুলোর। যাত্রাপালা ছিল ভক্ত প্রহ্লাদ। তার গানের কথা ও সুর যেন আজও ভেসে বেড়াচ্ছে অলিন্দের ফাঁকে। শোনা যাচ্ছে “তুমি হে প্রহ্লাদ পরশরতন অমৃত হইল বিষ তোমারই পরশে”! চারদিকে হৈ হৈ রৈ রৈ। বারান্দায় চিকের ফাঁক দিয়ে মেয়েদের সেই যাত্রাপালা দেখা। নবমীর দিনে হোত কাঙালিভোজন। পরের দিন বিসর্জন হোত নিকটবর্তী সরস্বতী নদীতে। একবার বিসর্জনের সময় দমকা হাওয়ায় হ্যাজাকের ফুলকি উড়ে গিয়ে পড়ল প্রতিমার ওপর অনেক চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা হোল না। সব শেষ। পরবর্তীকালে স্মৃতিচারণে অশতিপর দাদামশাইয়ের চোখের কোনে জল দেখে আমারও দু’গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ত বাঁধ না মানা অশ্রুধারা।

প্রাচীন দুর্গা প্রতিমা
(এই প[রিবারিক দুর্গাপুজোর ছবিটি বঙ্গাব্দ ৮ই আশ্বিন ১৩৩২ সাল / ইংরেজি ১৯২৫ সালের)

মেজদাদুর অংশের পাশে ন’দাদুর রঙিন কাঁচের জানলা, তার মধ্যেদিয়ে রাঙা রোদমাখা শোয়ার ঘরখানি। আহা কি সুন্দরই না লাগতো!
উঠোনের উলটো দিকে সেজদাদু ও ছোড়দাদুর ঘর ।
নিচের তলায় গৃহদেবতার সিংহাসনে রঘুনাথের বিগ্রহ। ঠাকুর ঘর।
তামার কোশাকুশি, তাম্রকুন্ড, পুষ্পপাত্র সদ্যফোটা ফুলের আর চন্দনের গন্ধমেখে ঘরখানি আমোদিত। চন্দন পিঁড়ি, চন্দনকাঠ, চামর, ধূপদান এখনো তো রয়েছে। সাদা কালো পাথরের বরফি আঁকা ঠান্ডা মেজে , বসলে প্রাণ মন জুড়োয়।
একটু বাঁয়ে ঘুরে সামনে খিড়কি দরজা,
ডানপাশে রান্নাঘর। কতরকমের যে উনুন – পাতা উনুন, কাঠের উনুন, তোলা উনুন।
এগোলেই খিড়কি দরজা। দরজা খুলতেই বাতাবি লেবু ফুলের তিক্ত কষা মধুর সুবাস যেন বন্ধুর মতো জড়িয়ে ধরে। পাশেই ধানের গোলা ।

খিড়কির পুকুর

গোয়াল ঘর থেকে গরুর হাম্বা, খুরের শব্দ শুনতে শুনতে খিড়কির পুকুরে আসা । আর সেই ঘটনাটা কি ভুলে থাকা যায় ? ভাত খেয়ে আঁচিয়ে মুখ তুলে দেখা । বাড়ির ছোট মেয়েটি ভাসতে ভাসতে পুকুর পাড়ের তালগাছের গোড়ায় আটকে আছে। তার কান্নায় তিনদা ছুটে এসে পাঁজকোলা করে তূলে তাকে বাঁচায়। এদিকে দাদামশাইয়ের রাধিকা পিসি রান্নাঘর থেকে ছুটে এসে তার গালে দিলেন কশে এক থাপ্পড়। এখনও তার ব্যথা বাজে।
ওপারে পচার দোকানটা না দেখে ফিরে যাবে ? মুড়ি, মুড়,কি, তেল, নুন সব আছে। বেলুন থেকে ঘুঁড়ি – কি নেই ? দেখে যাবে না?
সারির ঘাট? কণক চাঁপা গাছটা টুপটাপ করে ওর জলে ফুলের অঞ্জলি দিত। ওর জলে মিশতো চাঁপার গন্ধ। নতুন পুকুরের ধারের বকুল গাছটার তলা ঝরাফুলে থাকতো ভরে। কোচড়ভরা ফুলে মালা গাঁথা।
সেই ভালো লাগার দিনগুলো দিয়ে মালা গাঁথা কোনদিন কি শেষ হবে?

আর একটিবার সেই ভালোলাগার আবেশ মাখানো শৈশব, সেই সরল সুখের অনুভব, সেই মেঠো পথে অকারণ ছুটে চলার অনাবিল আনন্দ ফিরে পাওয়ার যে আকুতি, সে কি একেবারেই অলীক? একেবারেই অসম্ভব? একটি বার, শুধু আর একটি বার যদি সে ফিরে আসে!

———————————-

কাহিনিসূত্রঃ শ্রীমতী সুলতা ভট্টাচার্য্য

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.