শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

কুলুর দশেরা মোচ্চপ আর ঈশ্বরীকথা

আঁটোসাঁটো শহুরে মুখোশ কোনোমতে হিঁচড়ে খুলে, সিলিকা জেলে ডুবিয়ে রাখা ছোট বড় লেন্স, ব্যাগে পুরে, দীর্ঘ পাকদন্ডী অনর্গল ঘুরে, দশেরার দিন, পৌঁছে গিয়েছিলাম সবুজ চাদরে মোড়া কুলুর ধউলপুর উপত্যকায়। উৎসব শুরু হয়ে গেছে সকাল থেকেই। রংবাহারি সোনায় রূপোয় মোড়া ডোলিতে চড়ে, হরেকরকম ঢোল বাজিয়ে, লম্বা চকচকে শিঙ্গা ফুঁকে প্রায় একশোর কাছাকাছি দেব দেবীরা যে যার গুপ্ত কন্দর ছেড়ে নেমে এসেছেন

দেবভূমিতে, স্থান নিয়েছেন যে যাঁর হলুদ, লাল, সবুজ কাপড় পরা নিজস্ব আখড়ায়। এঁদের মধ্যে কেউ মানেশ্বর, কেউ ভীমকালী, কেউ আবার নৃসিংহ নাগ বা মনু ঋষি; উঁচু সিংহাসনে আসীন, পরনে ঝিলমিল ঝালরের রকমারি আড়ম্বর। এঁদের কোনো সুডৌল, আশীর্বাদী হাত নেই, সরু নায়িকা কোমর কিংবা অর্ধচন্দ্র গভীর নাভি নেই, প্রণয়ী বক্ষযুগল নেই, চকিত চপল চাহনি নেই, তেজি বলিষ্ঠ উরু নেই, এমনকি সঙ্গে সহজিয়া কোনো বাহনও নেই। শুধু পাথর, সোনা কিংবা রুপোর গায়ে শৈল্পিক চিন্তনে, এঁদের মনুষ্য মুখোবয়বের কল্পিত পরিচিতি লিখন। দেখে মনে হয় ইতিহাসের পাতায় এঁরাই বুঝি আর্যদের ঈশ্বর চেতনা প্রকাশের আদিরূপ – টোটেম প্রতীক। এঁদের সূত্র ধরেই হয়তো আমাদের এতশত দীর্ঘ এবং প্রচারিত রূপকথা, লোকগাথা, আচার, বিচার, ধর্ম, অধর্ম, সম্মিলিত অবচেতনের প্রবাহে, মন্দাকিনী, বিয়াসের স্রোতে স্বতঃস্ফূর্ত ঝর্ণা হয়ে ঝরে পড়েছে – গঙ্গা, যমুনা, ভাগীরথীতে; কালে কালে নরম অনিশ্চিত মাটিতে শিকড় ছড়িয়েছে; আচারের চালচিত্রে দেব দেবীরা ঘরোয়া হয়েছে। এঁদের বয়েস, জিগ্গেস করলে সঠিক কেউ বলতে পারেনা- কেউ বলে যুধিষ্ঠির, কেউ আলেকজান্ডার আবার কেউ কেউ সৃষ্টির ঊষাকাল।


এঁদের সঙ্গে আছেন এই দেবসংগমের প্রধান হোত্রি, মানালি এবং সংলগ্ন এলাকায় সর্বোচ্চ পূজিত দেবী, ভীমের বৌ, ঘটোৎকচের মা হিড়িম্বা; নির্বাসন অবসানে যিনি স্বামীর হাত ধরে ফিরে যান নি, যিনি নিভৃত গোপন গুহায়, তপস্যাবলে রাক্ষসী থেকে দেবীর স্ট্যাটাসে, নিজেকে উন্নীত করেছিলেন।
আছেন শ্রী রামচন্দ্রের সারোগেট পিতা – ঋষ্যশৃঙ্গ মুনিও। তিনি এসেছেন পনেরো হাজার ফিট উচ্চতায় জালদি পাসের গহন অরণ্যে স্থিত তাঁর মন্দিরবাস ছেড়ে।
ভক্তির তালা খুলে সবাই অপেক্ষায়। কখন সেই রথের ধ্বজা পাহাড়তলীর নীলিমা স্রোতে ভেসে উঠবে। কখন তিনি আসবেন। তিনি মানে – শ্রী রঘুনাথ- সেই মহাদেবতা যাঁকে অযোধ্যা থেকে উপত্যকায় চুরি করে আনা হয়েছিল আনুমানিক ষোলোশ শতাব্দীতে। ঘটনাটা ঘটিয়েছিলেন রাজা জগৎ সিংহ এক বিনীত বিশ্বাসী ব্রাহ্মণের মারফত। কারণ- এই রঘুনাথের চরণামৃত না খেলে তিনি শাপমুক্ত হবেন না। কী শাপ? রাজা তুমি দুর্গাদত্তের সঙ্গে যা করলে এর জন্য চিরকাল খেতে বসলে অন্ন”র স্থানে কীট আর জলের পাত্রে রক্ত দেখবে। কে এই দুর্গাদত্ত? সামান্য হালি, চাষ করে খেতো। অথচ গভীর জ্ঞান। রাজ সন্দেহের শিকার হতে হয়েছিল। কী সেই সন্দেহ? দুর্গাদত্তের কাছে নাকি অমূল্য এমন কিছু ধন আছে যা পৃথিবীর কারো কাছে নেই। দুঃখের বিষয়ে গবেট রাজা বুঝতে পারে নি, তলোয়ার কার্তুজ ছাড়া জ্ঞানও এক ধরণের অমূল্য ধন বা ক্ষমতা হতে পারে আর হতভাগ্য দুর্গাদত্ত ছিল সেই পরম ধনে ধনী।


দুপুর এলিয়ে পাইন বনের শির শিরে হাওয়ায় বিকেল প্রায় হব হব। হঠাৎ লাউডস্পিকারে শোরগোল, উদ্দাম ঢক্কানিনাদ। উন্মত্ত জনস্রোত অতর্কিতে আছড়ে পড়লো। দু-হাতে শরীর আর লেন্স বাঁচিয়ে উঠে পড়লাম অপল্কা কাঠের সিঁড়ি বেয়ে টিলার মাথায়। সাময়িক স্বস্তিতে লাইটমিটার দেখে ক্যামেরায় চোখ রাখলাম। ঢালু রাস্তা দিয়ে ওরা আসছে। ঝলমলে উর্দি পরে কাঁধে বড় বড় কাঁচের বাক্সে প্রখর আলো নিয়ে, ফুসফুস ফাটিয়ে, তোবড়ানো গাল প্রাণপণে ফুলিয়ে লম্বা চোঙা ফুঁকে ওরা আসছে। ক্লিক ক্লিক ক্লিক। ওদের পিছনে সুঠাম পাইনকাঠের ভেলভেটের গদিআঁটা চতুর্দোলায়, দুলকি চালে রাজা আসছেন। ক্লিক ক্লিক ক্লিক। রাজার হাতে গোলাপ গুচ্ছ ক্লিক। রাজার পিছনে ঝালর ছাতা। ক্লিক। রাজার মুকুটে হীরের ঝলক। ক্লিক। গোলাপ জল। ক্লিক। হাওয়ায় উড়ছে গাঁদার পাপড়ি। ক্লিক। রাজা মহেশ্বর সিংয়ের জয়। ক্লিক ক্লিক ক্লিক।


পালকি পৌঁছুলো শ্রী রঘুনাথের আখড়ায়। দেব মহলের হাইয়ার্কি মেনে এই আখড়াটি অন্য সব আখড়ার তুলনায় পরিসরে অনেক বড়, সাজানো এবং সদাই রঘুনাথের কীর্তি গানে মুখর। এখানেই মহাদেবতা অধিষ্ঠান করবেন আগামী দশ দিন।
কিন্তু কোথায় সেই দেবরথ? এখনো কত দেরি? সূর্য যে প্রায় পাটে বসতে যায়। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টিও শুরু হয়েছে। উতলা কৌতুহলী হৃদয়ের মাথায় শান্ত হাত রেখে রাজপুরোহিত বললে- এক গোধূলিতে আসেন তিনি / আর গোধূলিতে যান / দিন রাত্রের মধ্যক্ষণে / উনি বিরাজমান। আর তাই বুঝি তারা ঢাকা গোধূলিতে, পাঁচ মিশালী কথা সেরে দাঁড়িয়েছিলেম পথে- তুমি যখন এলে রাজন তোমার স্বর্ণ রথে।
এদেশে, খিচুড়ি, বেগুন ভাজা, শুক্ত, পায়েসের চল নেই। তাই রুপোর গেলাসে ফলের রস, রেকাবিতে গোটা আপেল, কমলালেবু, আখরোট, পেস্তা বাদাম, ধবধবে ক্রিম পনীর আর গামলা ভর্তি চুপচুপে দেশি ঘি-এর হালওয়া দিয়ে শুরু হলো আবাহন। রাজপুরোহিত,মহারাজ মহেশ্বরের হাতে তুলে দিলেন রুপো আর সোনার পাতে মোড়া ময়ূর পালক যুক্ত ধর্মদণ্ড। নরম কার্পেটে জানু পেতে রাজা, সেই দণ্ড মাথায় ঠেকিয়ে ধীর হাতে শ্রী রঘুনাথের স্বর্ণ সিংহাসনে রাখলেন। মুকুট খুলে প্রণাম করলেন। মুহুর্মুহু তোপধ্বনিতে পাহাড়ের অঙ্গচ্ছেদ করে খসে পড়লো বিরাট প্রস্তর খন্ড। ঠোক্কর খেতে খেতে ধুলো হয়ে মিলিয়ে গেলো বিয়াসের স্রোতে। কৌতূহলী জিগ্গেস করলে, আচ্ছা রাজা কি, পুণ্যে পাপে দুঃখে সুখে পতনে উত্থানে / মানুষ হইতে দাও তোমার সন্তানে, এই কথা বললেন? জানি না। সত্যি কে”ই বা জানতে পারে প্রার্থনা কার কিসের তরে / শব্দ সেতো শুকনো পাতা উড়তে থাকে মরু ঝড়ে।


দৈনন্দিন লজ্জিত জীবনের মুখে পর্দা টেনে, শুরু হয়ে গেলো দশদিনের ধউলপুরের দশেরা মোচ্চপ। সমস্ত আখড়ার দেবস্থল অনুরণিত হয়ে উঠলো অনর্গল ঘন্টা ধ্বনিতে। শাঁখ, উলু নয়, শিঙ্গা আর ঢোলের শব্দে দুলে উঠলো উপত্যকার গাছ পালা পশু পাখি। আর এসবেরই মধ্যে পাকা আপেলের মতো লাল টকটকে মুখ থেকে ওড়না সরিয়ে, জ্যোৎস্নার মতো হাসি ছড়িয়ে ঈশ্বরী এগিয়ে এলো কাছে। লজ্জার মাথা খেয়ে বললে- ক্যামেরা বাবু, তোলো না গো একটা ছবি। আমার নাগর সে যে বড্ডো দেখতে চায় আমাকে। সে থাকে বরফের মধ্যে ডুবে, সীমান্তে। আসবেই বলেছিলো এবার। কিছুতেই ছুটি পায়নি।
মেলা প্রাঙ্গন থেকে কিছুটা নিরিবিলি দূরে,তার পছন্দের পাইনতলায়ে কালো পাথরের ওপর নির্দ্বিধায় নিজেকে অজানা বুনো পাহাড়ি পাপড়ির মতো মেলে বসলো। যেন একজন অসম্ভব দাগহীন হৃদয়, কাউকে কোনোদিন দুঃখ দেবেনা একমাত্র পণ। ক্রমশ তার প্রাণোচ্ছল চোখের মণি হয়ে উঠলো নৃত্যরত শত ঝর্ণার উৎসব। ক্লিক ক্লিক ক্লিক। কালো বাক্সে আয়নার প্রতিফলনে স্বেচ্ছায় চিরবন্দি হলো- কুলুর ঈশ্বরী। নাকের নিচে জমা বিন্দুবিন্দু ঘাম হাতের পাতায় মুছে, লম্বা তামাটে লাল চুল মাথার ওপর বেঁধে, হুমড়ি খেয়ে জিগ্গেস করলে- “দেখতে পারি কেমন আমি তোমার চোখে ?”
“স্বেচ্ছায়”, বলে ক্যামেরা বাড়িয়ে দিলাম। হাতে নিয়ে কি ভাবলো জানি না, আমার দিকে তাকিয়ে রইলো এক দৃষ্টে।


“কি হলো দেখবে না ?”
“দেখছি তো “, বলে হেসে উঠলো ঈশ্বরী। তারপর চকিতে ক্যামেরা ফেরত দিয়ে , বললে ,”কাল সকালে মেলায় আসবে ?”
“নিশ্চই আসবো। কিন্তু কি আছে ?”
“এলেই দেখবে। দেরি কোরো না কিন্তু!”
“একদম না।”
“ঠিক আছে,চলি। দেখা হবে কাল”
শব্দগুলো চকচকে সাদা নুড়ির মতো আমার চার পাশে ছড়িয়ে তটিনী ঈশ্বরী নেমে গেলো এক পাথর থেকে অন্য পাথরের ওপর আধা আলতো পায়ে। শিরশিরে হাওয়ার ঝাঁপি খুলে দুলে উঠলো বৃদ্ধ পাইনবন। একটু পরেই শুরু হবে শ্রী রঘুনাথের সন্ধ্যারতি। মুহূর্তে মনে হলো আমিও এই দেবভূমির একজন। ইতিহাসের কোনো এক বিস্মৃতকালে এই পথ ধরেই আমার পূর্বজরা হেঁটেছিলেন ঝড়বৃষ্টি, মহামারী মন্বন্তর মাথায় করে। ওষ্ঠে ওষ্ঠ রেখেছিলেন ভবিষ্যৎ গড়ার প্রতুল স্বপ্নে। বলিষ্ঠ হাতে টানটান রুখে দাঁড়িয়েছিলেন অন্ত্যজ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। আমাদের মতো কৌশলী ছিলেন না তাঁরা। ওঁদের মধ্যে ছিল এই দেবভূমির পাহাড়ের মতো নিষ্ঠাবান অহংকার। সিগারেট ধরিয়ে বসে রইলাম সেই কালো পাথরের পিঠে। তার বুকে জমে থাকা সেই শত শত বছরের স্মৃতি স্পর্শ ইচ্ছায়। আর শিরশিরে অন্ধকারে অনেকক্ষন ক্যামেরার স্ক্রিনে জ্বলে রইলো ঈশ্বরী- তার মুখ টিপে হাসি, তার তেরছা চাহনি, তার নরম গালের টোল। আর দূরে গভীর দেওদার বনে মহাকাল মন্দিরে এক নাগাড়ে বেজে চললো ভারী ঘন্টা কোনো এক নির্দিষ্ট অন্ধ ভক্তের হাড্ডিসার হাতের নিবিষ্ট টানে।


পরের দিনের সকাল। হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে মনে হলো কেউ যেন আকাশ থেকে কলসি উপুড় করে লাল রং ঢেলে দিয়েছে কুলু কুলাঙ্গনাদের গায়ে। হলদে, সবুজ, আকাশি নীল- উধাও। চারিদিকে লালের লাবণ্য লালিত্যে ললনারা মুখর। কারু পরনে লাল ঘাগড়া, কেউ বা লাল কুর্তি, ঢোলা পাজামায়ে রূপসী নাগরী। রাস্তায় নেমে কিছুটা হাঁটতেই ঈশ্বরীর সংগে দেখা।
ওর লাল আলতা গাল লাল ওড়নার আঁচে আজ যেন লেলিহান। টিকোলো নাকের ওপর সোনার নাকছাবি শত সূর্যের শৌর্যে বাঙময়। জুতি পায়ে ঘুঙুরের ঠমকি চালে সাহেলীদের পাশ কাটিয়ে আমার কাছে এসে বললে- দেরি করলে কেন ?
“তোমাদের আজ কিসের উৎসব ?”
“আজ আমাদের রাজার সংগে নাগোড়ালীর দিন। আজ আমরা সবাই রাজার সঙ্গে নাচবো গাইবো। আজকের দিনে রাজা আমাদের সবার নাগর।”
“আর তোমাদের বাড়ির পুরুষেরা ?”
“ওরাও থাকবে রাজার সঙ্গে। ওই দেখো না ওরা কেমন ফুলের ঝালর মাথায় পড়েছে । তুমি পড়বে ? নাগর হয়ে নাচবে আমাদের সঙ্গে? এসো না। চিন্তা নেই। কোনো শর্ত নেই। কেউ কিচ্ছু বলবে না। আমাদের আকাশে মেঘের রং স্বচ্ছ, সাদা।”
“তা কি করে হবে? আমি যে এসেছি তোমাদের এইসব বিচিত্র আনন্দের মুহূর্তকে, ফুল তোলার মতো তুলে , স্মৃতির সুঁতোয় মালা গাঁথতে।”
“বেশ তাহলে তুমি এক কাজ করো। ওই টিলাটার ওপর গিয়ে বসো। ওখান থেকে তুমি সবাইকে দেখতে পাবে, আমাকেও।”
ঈশ্বরীর নির্দেশ মতো উঠে বসলাম। পাহাড়ি গানের মিষ্টি সুরে অনুষ্ঠান শুরু হলো। মনে হলো ময়দান জুড়ে লোহিত লালিমা সাগরে সারাটা কুলু শহর ভাসছে। রাজা ভাসছে। রানী ভাসছে। নাগর ভাসছে। নাগরী ভাসছে। বেলুন ভাসছে। নির্দিষ্ট তালে, ছন্দে, নির্মিত বৃত্তে, বৃত্তান্তরে – আন্দোলিত আনন্দ মোহনায়। এ যেন এক অন্যতর সাম্যবাদ যেখানে লাল আছে কিন্তু লালসা নেই, যেখানে অন্তরা আছে কিন্তু অন্তরায় নেই, যেখানে- তুমি কে? প্রশ্নের, ধুয়া তুলে উত্তর আসে, আমরা মানুষ- আমরা একই সূর্যের শত সহস্র কণা; আমাদের সবার এক বেশ, একই বেষ্টন।


আসর ভাঙতে প্রায় দুপুর গড়িয়ে বিকেল। ঈশ্বরী জানালো এই রকমই হয়ে থাকে প্রতি বছর। তারপর তর্জনী নির্দেশে বললে, “প্রত্যেকটি ছবি কিন্তু আমার চাই। একজন কিন্তু অপেক্ষা করছে। তুমি ধোঁকা দেবে না তো?”
“না না, খামে করে প্রত্যেকটা পাঠিয়ে দোব। চিন্তা করো না।”
“আমার ঠিকানা জানো? আমি কোথায় থাকি জানো? কিচ্ছু জানো না, আর বলছো খামে করে পাঠিয়ে দেবে”!
“না বললে জানবো কি করে? আমি তো আর তোমাদের রঘুনাথ নই।”
“শোনো আমাদের দেবতা, জমলু বাবাজি, সপ্তঋষির একজন। তিনিই ঋষি জমদগ্নি।”
“সে তো শুনেছি পরশুরামের বাবা। পায়েসের মতো আগুন সাপটে খেতেন।”
“রসিকতা নয়। এইসব দেবতার জন্ম বাবাজির ঝুড়ি থেকে।”
“সে আবার কি? মানে আজকের দিনেও এইসব!”


“সে এক ভয়ঙ্কর ঝড়ের সন্ধে। চারিদিক উথাল পাথাল। তপস্যা শেষে জমলু বাবাজি দেবতাদের মূর্তি ঝুড়িতে নিয়ে ফিরছিলেন। হঠাৎ পাথরে পা পিছলে পরে যান। ঝুড়ি থেকে দেবতারা ছিটকে পড়েন, কেউ গড়িয়ে যান খাদে, কেউ অন্য কোনো উপত্যকায়। পরের দিন আদিবাসীরা ভয় মিশ্রিত কৌতূহলে সেই সব মূর্তি তুলে যে যার গ্রামে প্রতিষ্ঠা করে উপাসনা শুরু করেন। ক্রমে সম্মিলিত এইসব দেবদেবীদের মহিমায় এই স্থান হয়ে ওঠে দেবভূমি। আর সেইদিনের সেইসব মূর্তিই আজ নেমে এসেছে মেলায়। তুমি ঘুরে ফিরে তাদেরই ছবি তুলছিলে।”
পৃথিবীতে কিছু সরল বিশ্বাস এখনো স্বচ্ছ, কচি ঘাসের মতো রয়ে যায়, যুক্তি প্রযুক্তির গাঁইতি কোদাল যতই তাদের ওপর দুর্মর হয়ে উঠুক না কেন। তাই ওসব তর্কের ঘরে শিকল তুলে জিজ্ঞেস করলাম- তোমাদের ঋষির বাড়ি মানে আশ্রম কোথায় ছিল জানা আছে ?”
“আশ্চর্য ! সেখানেই তো আমরা থাকি। পার্বতী পাহাড়ে – মালানায়।”


“কত দূর?”
“এখন থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার। তুমি যাবে?”
“নিশ্চই। তুমি নিয়ে গেলে যাবো না কেন।”
“সেখানে কিন্তু কোনো গাড়ি চলে না। পাহাড়ের গা বেয়ে সরু খাড়াই পথ পায়ে হেঁটে উঠতে হয়। তুমি পারবে?”
“পার্বতী শক্তি দিলে নিশ্চই পারবো।”
ঈশ্বরীর সঙ্গে গাড়ি ভাড়া করে ঘন্টা চারেকে পৌঁছে গেলাম পরের দিন পার্বতীর পাদদেশে। তারপর প্রায় ৬ কিলোমিটার অসম্ভব খাড়াই পথে ট্রেকিং। কোথাও রাস্তা আছে কোথাও শুধু পাথর। কোথাও তিরতিরে ঝর্ণা, কোথাও হাড়হিম করা খাদ। এটাই নাকি মালানাবাসীদের দৈনন্দিন যাওয়া আসার পথ। এদের না আছে মেট্রো না আছে উবার, ওলা, না আছে অটো রিক্সা। এদের সবটাই পায়ে হেঁটে, ঠোক্কর খেয়ে, শিরদাঁড়া সোজা করে পাথর ডিঙিয়ে। আলেকজান্ডারের সঙ্গে আসা গ্রিক সেনাপতিদের বংশধরদের এই গ্রামে, না আছে বিগ বাজার না আছে হোর্ডিং হাজার। চুন, সুরকি, ইঁট, সিমেন্ট আনার অবকাশ কোনোটারই নেই তাই গাছ কেটে, পাতা ছেঁটে- ঘরবাড়ি, চার হাজার প্রায় মিতবাক, নিরিবিলি গ্রাম বাসীদের।
চতুর্দিকে ধান গাছের মতো গাঁজার চাষ। মাঝে মাঝে ছিট্ জমিতে আলু কিংবা ভুট্টা। রাস্তায় লোক নেই বললেই চলে, কয়েক জন ছাড়া- ওরা ফসল কেটে পিঠে করে, আঁটি বেঁধে গাঁজা গাছ, বয়ে তুলছে ঘরে। ওগুলো খড়ের মতো কাটা হবে, রোদে শুকনো হবে, তৈরী হবে এ দেশের শ্রেষ্ঠ মারিজুয়ানা- হ্যাশ- চরসের গুলি- নেশারুদের প্রিয় মালানা ক্রীম। অপ্রত্যাশিত এইসব দেখে শুনে ঈশ্বরীকে জিজ্ঞেস করলাম- “ছবি তোলা শুরু করি?”


“একদম না। এখানে ছবি তোলা নিষিদ্ধ।”
“তাহলে?”
“তাহলে আবার কি? আমি সুযোগ বুঝে বলবো যখন, তখন যা পারো কোরো। এখন আলটপকা ক্যামেরা চালালে হেনস্থা হতে হবে।”
“নিয়ম ?”
“বিধান – পঞ্চায়েতের। এখন চলো জমলু বাবার মন্দিরে যাই। তার পর বাড়ি গিয়ে নাস্তা করবে।”
গ্রামের মধ্যস্থলে অনেকটা খোলা জায়গা নিয়ে সুন্দর কাঠের কারুকাজ করা, তিব্বতি গড়নে গড়া ঋষি জমদগ্নির মন্দির। দেয়ালে ফুল বেল পাতা মালা কিংবা সিঁদুর লেপা লক্ষ্মী নয়, উৎসর্গীকৃত ভিন্ন জাতের খুলির সমাহার। চারিদিক শান্ত সমাহিত, ছমছমে। ভারী কাঠের দরজা খুলে পৌঁছালাম জনহীন গর্ভগৃহে। দেবতা বলতে অগ্নি- তিনি শক্তি, তিনি স্থির, তিনি দীপ্ত, তিনি জাগরণ, তিনি সময়হীন, ত্রিভুজ কালপাথরের পিলসুজে। তিনি যেন কোন কল্যাণী পার্বতী শূন্যপথ বেয়ে নেমে এসেছেন মাতৃবেশে। তাঁরই অবিনশ্বরী তেজে এ গ্রামের ঘরে ঘরে দীপ জ্বলে, উৎসব হয়।
“আমাদের নিত্যশুচি স্পর্শমনি, এসো একে স্পর্শ করো। হাত জোড় করো। তিন বার ফেরা কাটো।”
“তারপর?”
“ভূমিপুত্র, তুমি অগ্নিশুদ্ধ।” ঈশ্বরীর ফিসফিসিয়ে কথাগুলো গর্ভগৃহে প্রতিধ্বনিত হয়। তারা অপূর্ব প্রাণ নিয়ে, ফিরে ফিরে আসতে লাগলো। ওর চোখের পাতা থেকে, দেখলাম, ঝরে পড়ছে ব্রহ্মান্ডের অসীম নীল উষ্ণ আত্মীয়তা। এ এমন এক জ্যোতির্ময় মুহূর্ত যখন” আমি” শব্দটা খুঁজে পায়ে নতুন ব্যঞ্জনা, সে অজান্তে হয়ে ওঠে “রাজা”। এ এমন এক পাট খুলে বেরিয়ে আশা অভূত ক্ষণ যখন মনে আসে বহু বছর আগে অজয় নদের শীত সকালে হরিদাসী বোষ্টমী স্নান সেরে ভিজে জটা লাল কাপড়ে মুড়ে বলেছিলো- ওগো আমার গোঁসাই ঠাকুর, এস না কন্ঠী বদল করি।
মন্দির থেকে ঈশ্বরীর বাড়ি কিছটা দূরে। কাঠের সিঁড়ি পার করে দোতলার প্রায় নেই আলো ঘর। কার্পেট পাতা ছিমছাম। সুন্দর তামাকের গন্ধ পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কে খাচ্ছে?
“আমার দাদি।”
“তোমার মা, বাবা, ভাই বোন?”
“বাবা তো মান্ডিতে, শালের কারখানায়। মা আর ভাই গেছে পঞ্চায়েতে, মিটিঙে।”
“কিসের মিটিং?”
“ওই শহর থেকে বাবুরা এসে যাতে এখানে হোটেল, রেস্টুরেন্ট আর কোনোদিন না খুলতে পারে, তার পিটিশন। আমরা চাইনা আমাদের জমলু বাবার এই পুণ্যভূমি কলুষিত হোক। ওরাই তো একবার ওই ২০০৮ সালে আগুন লাগিয়েছিল আমাদের গ্রামে। ভেবেছিলো পয়সা দিয়ে পার পাবে। হাঃ!!! জমলু বাবা ছাড়েনি। ওদেরকেই শেষে কাবাবের মতো ঝলসে পুড়ে মরতে হয়েছিল।”
কথাগুলো অনুসরণ করে, নিখুঁত মসৃন পাইন কাঠের ওপর কাজ করা ময়ূরী রেকাবিতে পুদিনা পাতা দিয়ে ফলের রস, আখরোট, বাদাম এলো। সঙ্গে সদ্য ক্ষেত থেকে তুলে আনা কচি পাতার তামাক। অতিথি আপ্যায়নের এইটাই ব্যক্তিগত মানালা রীতি।
কথায় কথায়, নরম তাকিয়ায়ে, গড়গড়ার নল ওষ্ঠ রসে সিক্ত হলে পর, মৌতাত জমে ওঠে। এক সময় অনিচ্ছা সত্ত্বেও জিগ্গেস করলাম- তোমার নাগর এই গ্রামেরই মানুষ? তার বাড়ি দেখাবে না? তার ছবি?
“নিশ্চই! যাবে এখন?”
“সে কি এখন তো রাত”!
“আজ পূর্ণিমা। আজ আমাদের গ্রামে, চাঁদ, সূর্য হয়ে জ্বলে।”


বাইরে “কোজাগরীর- কে জাগরী”-র নিশুত রাত। লম্বা চাট্টানের ওপর বসে মনে এলো ধলেশ্বরীর সেই মেয়েটির পুণ্যকামিনী মুখ। হয়তো এখন চৌকাঠে আল্পনা দিয়ে, ধূপ জ্বালিয়েছে। হয়তো নারকেলনাডু, চিঁড়ে ভেজে, মঙ্গল ভিক্ষা করে গলবস্ত্রে মাথা ঠুকছে শানে।


ঈশ্বরী উঠে এলো পাশে। বসলো অনেকটাই গা ঘেঁষে। হাতে হাত রেখে বললে-
“ওই যে দেখো ঐখানে ওই রডোডেনড্রন বনের ধারে আমার নাগর থাকে।”
সেখানে জ্যোৎস্না পড়েছে শানের ওপর। সেখানে শুকনো পাতার খড় খড় শব্দে হাওয়া কথা বলে। সেখানে আকাশ শূন্য সুন্দর। সেখানে তিরতিরে ঝর্ণার জলে জীবনের অনন্ত গভীর সত্য প্রতিবিম্বিত হয়। সেখানে শীত রাতে কুন্ডলি পাকিয়ে লোমশ বিশালকায় বৃদ্ধ সারমেয় আগলে রাখে স্মৃতি- ভালোবেসে ভালোবাসার স্মৃতি। সেখানে অনেক কথা মিথ্যে মনে হলেও মিথ্যে নয়।
অসম্ভব ঠান্ডা একটা অনুভূতি আমার শরীরে প্রবেশ করলো। মাঝসমুদ্দুরে কম্পাসহারা নাবিকের মতো আমি তাকালাম ঈশ্বরীর ছলছল চোখের দিকে।
“কি ভাবছো?”
“তুমি- মানে যা সব বলেছিলে সব।”
“ছবিগুলো দেবে তো?”
“নিশ্চই – কেন দেব না। কিন্তু-“?
“কিন্তু কী? শোনো, পৃথিবীর অনেক কিছু মিথ্যে মনে হলেও মিথ্যে নয়। তুমি ভাবছো ছবিগুলো কেন চাইলাম?”
“সত্যি তো কেন?”
“কেন না শেষ দিন পর্যন্ত ও আমায় দেখতে চেয়েছিলো। পায়নি। হয়তো শেষ মুহূর্তে আমায় দেখাতে চেয়েছিলো কেমন শত্রূর গুলিতে ভীষণ ঝাঁজরা হয় গেছে শরীর। সেটাও পারেনি।”
“কিন্তু আজ- কী করবে ওদের নিয়ে?”
“ওই যেখানে মৃত্তিকামগ্ন শুয়ে আছে সেখানে রাখবো আর বলবো,ওগো আকাশজোড়া, ওগো নীল নজর, তুমি দেখো, প্রাণ ভরে আমায় দেখো। ভালোবাসার সম্পর্কে কেউ চলে যায় না। চলে গিয়েও রয়ে যায়। মৃত্যু সে তো একটা বিভ্রম।”
আমাদের মাথার ওপরে ঝুলে থাকা চাঁদকে, নাম না জানা রাতজাগা পাখি উড়তে উড়তে দু খন্ড করে দিলো। এক চিলতে থুতনি রাতের আদিগন্ত নির্জনে, কাঁধের ওপর রেখে সে বললে- “সবই যখন জানলে তখন এসো না কোনো গভীর গোপন উপকূলে গিয়ে বসি?”
“সে কেমন করে হবে? আমি যে পরপুরুষ।”
“আমরা, পর নয় পরম, পরকীয়া নয় পরমক্রিয়া, বুঝি গো। এসো, ওষ্ঠ আঘাতে শতখণ্ড করে দিই এই জ্যোৎস্নার যতসব কবিতার অসহ্য নিয়ম।”
“এ কি আরো কোন কথা রাখার অপার প্রয়াস?” থামিয়ে দিয়ে জিগ্গেস করলাম।
“প্রচেষ্টা- সমস্ত পর্দা সরিয়ে দেখানোর, আমার শরীর জুড়ে এখনো সারা রাত কেমন আমার প্রেম, আমার নাগর নাচে”। ঈশ্বরীর চোখের শিরায় শিরায় তখন বিদ্যুতেরা ছুটে বেড়াচ্ছে ক্ষুধার্ত চিতার মতো।


পরের দিন ভোরে, আকাশের চোরা গলি পাখির ভিড়ে উপচে পড়ার আগে, নেমে এলাম সমতলে। ফিরলাম মেলায়। সেখানে নাগরদোলা এখনো আগের মতোই, ঘুরছে। ক্যাঁচ কুঁচ, ক্যাঁচ কুঁচ যন্ত্রের পিষ্টনে। একটু পরেই শ্রী রঘুনাথ, রথে চড়ে যাত্রা শুরু করবেন। অন্য দেব দেবীরাও। সমস্ত আখড়ায় নিভে যাবে আলো; সঙ্গে সঙ্গে অনেক মানুষের মানুষ হয়ে ওঠার ইচ্ছা। জেগে থাকবে অবসাদ, ছবি, ঈশ্বরী তোমার – শর্তহীন প্রেম, বিধিহীন ভালোবাসা। মেঘশান্তির আকাশে জেগে থাকবে পাইন বন, শেওলা পাথর, জমদগ্নি শিখা তোমার- সহজিয়া ঈশ্বরীকথা।

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.