শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

নিরালা দুপুরের ভয়ঙ্করের গল্প

আমি যৌথ পরিবারে বড় হয়েছি। বাড়িতে বাবা, মা, দাদু, কাকা, কাকিমা ছোট ছোট ভাই আর দাদাদের সাথেই আমার বেড়ে ওঠা। এছাড়া প্রতিবেশী সমবয়সী বন্ধুরা তো ছিলই। সারাদিনে স্কুলে যাওয়া, পড়াশুনো ছাড়াও খেলা-ধুলো, ঝগড়া-খুনসুটিতে ভারী ব্যস্ত থাকতাম। তবু এসবের মধ্যেও সেই অল্প বয়স থেকেই প্রতিদিন কিছুক্ষণের জন্য আমি সবার থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে একা হয়ে যেতাম। এই সময়টুকু আমার একান্তভাবে ‘আমারই’ হয়ে উঠত। আমার বিচিত্র ভাবনাগুলো তখন ডানা মেলে আকাশে ভেসে বেড়াতো। সম্পূর্ণ একটা আলাদা জগতে আমি এই সময়টুকুতে হারিয়ে যেতাম। এটা আমাকে দারুণ তৃপ্তি আর আনন্দ দিত। এই অভ্যেসটা আমার আজও বজায় আছে। সংসারে সারাদিন আমার যত ব্যস্ততাই থাকুক, সব কাজ শেষ হলে আমি কিছুটা সময় আমার নিজস্ব পছন্দের কাজে, যেমন বই পড়া, কিছু লেখা, সেলাই, উলবোনা ইত্যাদিতে মশগুল হয়ে থাকি। এটা আমার চাইই চাই।


আমি যখন প্রাইমারিতে পড়ি, তখন আমার স্কুলটাইম ছিল সকালে। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার আগেই বাবা-কাকারা অফিসে, আর দাদারা তাদের স্কুলে বেরিয়ে যেত। সারাদিন বাড়িতে মা, কাকিমা ছোট ভাইদের সাথে আমি একা থাকতাম। প্রতিবেশী বাড়িগুলিও একই রকম ফাঁকা ফাঁকা। দুপুরে খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেলে মা, কাকিমারা আমাদের ছোটদের ঘুম পাড়িয়ে নিজেরাও একটু ঘুমিয়ে নিতেন। তখন চারিদিক অনেকটা নিঝুম, নিস্তব্ধ। আমি কিন্তু এই সময় একা বাড়ির বাইরে বেরিয়ে সামনের পুকুর পাড়ে, জলের উপর অনেকটা হেলে পড়া মস্ত একটা বাদাম গাছের গুড়িতে গিয়ে বসতাম। পুকুরের জলের ঢেউয়ে ক্রমাগত ধুয়ে যেতে যেতে সেই গাছের শিকড়ের মাটি অনেকটাই ধুয়ে ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। জলের ওপর হেলে পড়া সেই মোটা মোটা শিকড়গুলো বস্তুত জলের ওপরে একটা মাচার মত হয়ে গেছিল। আমার কাজ ছিল সেই নির্জন দুপুরে প্রতিদিন সেই মাচায় বসে নিচে নিস্তরঙ্গ পুকুরের জলের দিকে একমনে তাকিয়ে থাকা। একটু দূরে পুকুরের শান বাঁধানো ঘাটে কোনো মানুষ নেই। জলের ওপর কোন আলোড়ন নেই। প্রখর সূর্যের আলোয় তখন পুকুরের প্রায় তলদেশ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। এমন নিরিবিলি সময়ে মাছেরা ঝাঁক বেঁধে আপন ইচ্ছায় জলের ওপর দিকে উঠে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াতে। হয়তো হঠাৎ একটা সাপ সাঁতার কেটে পুকুরের এপার থেকে ওপারে চলে যাচ্ছে। আমি জানতাম, এটা ‘জল ঢোরা’ সাপ, এর কোনো বিষ নেই। আবার দেখতাম একটা মা শোলমাছ আগে আগে চলে যাচ্ছে, পেছনে তার খুব ছোট ছোট বাচ্চারা ঝাঁক বেঁধে সার দিয়ে তাদের মাকে অনুসরণ করছে। এই দৃশ্য দেখতে আমার খুব ভাল লাগত। আমি রান্নাঘর থেকে মুঠোয় করে কিছুটা ভাত এনে মাছেদের দিকে একটু করে ছুঁড়ে দিতাম। ভাত খাওয়ার লোভে আরও আরও মাছ এসে সেখানে ভিড় জমাতো। আমি একমনে ওদের দেখতাম। এভাবে কত সময় কেটে যেত আমার খেয়াল থাকতো না। হঠাৎ বাড়ি থেকে ডাক শুনে তাড়াতাড়ি ঘরে চলে আসতাম। এভাবেই একদিন মাছেদের ভাত খাওয়াচ্ছি, ওরাও সেই মাচার তলায় বেশ ভিড় জমিয়েছে, হঠাৎ আমার চোখ আটকে গেল একটু দূরে জলের তলায় একটা জমাট অন্ধকার মতো প্রকান্ড একটা কালো অংশের দিকে। জিনিসটা একটুও নড়ছে না।

একেবারে স্থির হয়ে আছে। ভাবলাম হয়ত কোন বড় পাথরের চাই গড়িয়ে পুকুরে পড়ে গিয়ে ওখানে আটকে আছে, ওপর থেকে ওরকম দেখাচ্ছে। তবু কেমন একটা অস্বস্তি নিয়ে তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরে এলাম। পরদিন আবার যখন একইভাবে ভাত নিয়ে সেই নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে বসলাম, প্রথমেই চোখ চলে গেল সেই অন্ধকার জায়গার দিকে। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম সেখানে সেখানে কোনো অন্ধকার নেই। যাই হোক, আমি রোজকার মত মাছেদের ভাত খাওয়াতে লাগলাম। ওদের খাওয়ার আনন্দ দেখতে দেখতে বিভোর হয়ে গেছি, আচমকা চোখ আটকে গেল সেই কালো আবছায়া অংশটায়। ও মা, একী! একটু আগেই যে জায়গাটা একদম পরিষ্কার ছিল, সেখানে এখন দেখছি আবার সেই বিশাল জমাট অন্ধকার। একঝটকায় বুঝে গেলাম এটা কোন পাথরের চাই নয়। যে কোনও জীবন্ত জিনিস। এর আগে শুনেছি নির্জন পুকুরে এক নামতে নেই। জলের একেবারে তলের দিকে নাকি “মাইঠ” নামে একটা দানব জাতীয় কিছু বাস করে। তারা কোন একলা বাচ্চা পেলেই কামড়ে একেবারে জলের তলায় নিয়ে যায়। ভয়ে দারুনভাবে শিউরে উঠলাম। তাড়াতাড়ি ঘরে এসে চুপ করে ঘুমন্ত মায়ের পাশে শুয়ে পড়লাম। মনে মনে ভাবলাম, আর কখনও এইভাবে একা একা পুকুর পাড়ে যাবোনা। কিন্তু কাউকেই এই বিষয়ে কিছু বললাম না। ভাবলাম, একথা শুনে যদি সবাই আমাকে ভীতু বলে হাসাহাসি করে! কিন্তু পরের দিন সেই নির্জন দুপুরে আমাকে কে যেন এক অমোঘ টানে পুকুর পাড়ে সেই নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে গেল। প্রথমেই যথারীতি চোখ চলে গেল সেই একটু দূরের অন্ধকার জায়গাটার দিকে। দেখলাম, সেখানে কোন অন্ধকার নেই। আবার মাছেদের ভাত খাওয়াতে লাগলাম।

মাছেরাও একে একে ভিড় জমাতে লাগল। আমি নিমগ্ন। হঠাৎ সেই ভয়ঙ্করের কথা মনে পড়তেই সে দিকে তাকালাম। এ কি! সেই জায়গাটা আবার আবার কালো হয়ে আছে। এবার যেন মনে হল, সেই বিশাল অন্ধকারটা একটু নড়ে উঠলো! ভীষণ ভয় পেয়ে একছুটে একেবারে ঘরে। কিন্তু প্রতিদিন দুপুরের সেই অমোঘ তাঁকে আমি কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারছিলাম না। ইতিমধ্যে একদিন আমি সেই অন্ধকারকে আবার নড়ে উঠতে দেখলাম। একই সাথে সেখানে একটা যেন লাল টকটকে টুনি বাল্ব দেখতে পেলাম। যথারীতি ভয় পেলাম। এভাবে আরও বেশ কিছু দুপুর এই ভয়ের সঙ্গে আমার লুকোচুরি খেলা চলেছিল। অবশেষে আমার পরীক্ষার পর ক্লাস ফাইভ হয়ে গেল। আমার স্কুলটাইমও দুপুরে হয়ে গেল। আর দুপুরের সেই নিস্তব্ধ অবসর নেই। একের পর এক ক্লাস বাড়তে লাগলো। সেই সাথে পড়াশুনার চাপও অনেক বেড়ে গেল। ক্রমে আমি সেই নির্জন দুপুরের ভীতিকর অভিজ্ঞতার কথাও ভুলে গেলাম। বেশ কয়েক বছর পর আমি বোধহয় ক্লাস নাইনে, তখন হঠাৎ একদিন দেখি পুকুরের তিন দিকে তিনটি পাম্প বসিয়ে পুকুরের জল বের করে দেওয়া হচ্ছে। শুনলাম পুকুরটার সংস্কার হবে। আরও বড়, আরও গভীর করা হবে। সারাক্ষণ সেই পাম্পের ভট্ ভট্‌ আওয়াজে কান ঝালাপালা হতে লাগল। পুকুরের জলও প্রতিদিন কমতে লাগল। একদিন স্কুলে যাওয়ার সময় দেখলাম জল এতটাই কমে গেছে যে মনে হল আজই বোধহয় সবটাই তোলা হয়ে যাবে। সেইদিন স্কুল থেকে ফিরে দেখি পুকুরে থকথকে কাদা আর এক কোনায় বেশ কিছু মানুষের জটলা। কৌতূহলী হয়ে সেখানে আমিও উঁকি দিলাম। দেখি সেই থকথকে কাদায় মানুষ সমান দুটো ইয়া বড় মাছ পড়ে আছে। একটা মাছ একটু নড়ে ওপাশ ফিরতেই দেখি সেই লাল টকটকে টুনি বাল্বের মত চোখ। সাথেসাথেই আমার অনেক দিন আগের সেই দুপুরের ভয়ংকরকে মনে পড়ে গেল। শুনলাম এগুলো কে “গজাল মাছ” বলে। বড় বড় পুকুরে এরা দু’তিনটে করে থাকে। পুকুরের অন্যান্য মাছই এদের খাদ্য। তখন আমি বড় হয়ে গেছি। বিজ্ঞান নিয়ে পড়ছি। তাই অনায়াসেই বুঝে গেলাম মাচার তলায় ভাত খেতে আসা মাছের ঝাঁকই ছিল তখন ওর টার্গেট।

Facebook Comments Box

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.