শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোচনা ও চর্চা

বিচিত্রকর্মা এক ঠাকুরের কথা

বিস্মৃতিচারণা – পর্ব (৩)

স্মৃতি-বিস্মৃতির আলপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে খ্যাত অখ্যাত কত মানুষই যে ভেসে ওঠেন চোখের সামনে! আজ আমার কৈশোর স্মৃতির আয়নায় ধরা দিলেন রবীন্দ্রনাথের তৃতীয় প্রজন্মের এক অসামান্য পুরুষ। তিনি সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

পরিচয়টা একটু বিশদভাবে জানিয়ে আমার স্মৃতির ঝাঁপিটি খুলব। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের প্রপৌত্র, কবির বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৌত্র তিনি। পিতা, সুধীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পৌত্র হিসেবে দাদু রবীন্দ্রনাথকে সম্বোধন করতেন ‘রবিদা’ বলে। পান্ডিত্য ও প্রজ্ঞার আখর, বহুভাষাবিদ, একাধারে তদানীন্তন বাংলার অন্যতম সেরা বাগ্মী, ক্ষুরধার স্পষ্টবক্তা রাজনীতিক, প্রাবন্ধিক ও পুস্তক প্রণেতা, রবীন্দ্রসঙ্গীত বিশেষজ্ঞ, সঙ্গীত ও নৃত্য প্রশিক্ষণ বিদ্যালয় ‘বৈতানিক’-এর কর্ণধার। তরুণ বয়সে সাম্যবাদী রাজনীতিতে হাতেখড়ি দিয়ে জার্মানি ও রাশিয়ায় অবস্থান, কমিউনিজমের পাঠ ও চর্চা। এক কথায় জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির বিপরীতমুখী এক স্রোতের সন্তান সৌম্যেন্দ্রনাথ। প্রিয় ‘রবিদা’র সমর্থন পায়নি তাঁর রাজনীতি। যদিও রবীন্দ্রনাথের রাশিয়া ভ্রমণের তিনিই ছিলেন সহযোগী সহযাত্রী। লৌহমানব স্ট্যালিনের রাশিয়ায় গিয়ে প্রখ্যাত লেখক ম্যাক্সিম গোর্কিকে চিন্তিত করে তাঁর কাছে স্টালিনের রাজনীতির কঠিন সমালোচনা করে এসেছিলেন তিনি, যা তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রীতিমত দুঃসাহসিক।

রবীন্দ্রনাথের রাশিয়া ভ্রমণের সঙ্গী তরুণ সৌম্যেন্দ্রনাথ

এহেন সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আমার প্রথম দর্শন পিতৃদেব প্রভাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৌজন্যে। তাঁর সঙ্গে স্নেহ ও শ্রদ্ধার নিবিড় সম্পর্ক দেখেছি সৌম্যেন্দ্রনাথের। পিতার আমন্ত্রণেই ষাঠের দশকের শেষভাগে তিনি এসেছিলেন আগরপাড়া পাঠাগারের ৭৫ বছর পূর্তি উৎসবের স্মারক বক্তৃতা দিতে। সেই উপলক্ষে আমাদের গৃহে তাঁর পদার্পণ। আমি তখন কৈশোর উত্তীর্ণ এক নাবালকমাত্র। কিন্তু অর্ধ শতাব্দী আগের সেই স্মৃতি আজও অমলিনভাবেই ধরা দেয় মনের আয়নায়।

শ্বেতশুভ্র ধুতি পাঞ্জাবীতে শোভিত এক শালপ্রাংশু মহাভুজ। ছ’ফুটের ওপর উচ্চতা, অতি উজ্বল গাত্রবর্ণ, শশ্রুগুম্ফহীন ধারাল মুখমন্ডল, কিঞ্চিৎ দীর্ঘ চুল ছুঁয়ে আছে চওড়া কাঁধকে। পিতা তাঁর সামনে হাজির করিয়ে পরিচয় করিয়ে দিলেন। প্রণাম করতেই অভিজাত কণ্ঠস্বরে স্নেহময় কুশলপ্রশ্ন। সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ বিস্ময়াভিভূত আমি তখন দাড়ি গোঁফবিহীন রবীন্দ্রনাথকে খুঁজছি ঠাকুরবাড়ির রাজকীয় প্রতিনিধিটির মধ্যে। বাবা বললেন, ‘রবীন্দ্রনাথকে তো দেখনি, এঁর চেহারার মধ্যেই কবিকে কল্পনা নিতে পার।’ হাসলেন সৌম্যেন্দ্রনাথ।

শালপ্রাংশু মহাভুজ – পরিণত বয়সে সৌম্যেন্দ্রনাথ

অবাক হয়ে সেদিন শুনেছিলাম পিতৃদেবের সঙ্গে তাঁর আলাপচারিতা, অর্ধ শতাব্দী পেরিয়ে এসেও মনের ক্যানভাসে যার নির্যাসটুকু চিত্রিত হয়ে আছে প্রায় অবিকৃতভাবে। মনে আছে, শুনে ভাবছিলাম যে এমন সুন্দর করেও তাহলে কথা বলা যায়!

কথোপকথনের ফাঁকে বাবা একবার কিছুটা আক্ষেপের সুরে বললেন: ‘আপনার রাজনীতির কর্মকান্ড বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতির জগৎ থেকে আপনাকে অনেকাংশেই দূরবর্তী করে রাখল! এমন একটি উজ্বল প্রতিভার আলো থেকে বঞ্চিত হলাম আমরা। এ ক্ষতি অপূরণীয়।’

সৌম্যেন্দ্রনাথ হেসে বললেন, ‘তুমি কি বলবে হে! আমার রাজনৈতিক জীবনের গোড়ার দিকে স্বয়ং রবিদা’ মোক্ষম কথাটি বলে গিয়েছিলেন। কী বিপদেই না পড়েছিলুম সেদিন! তাহলে গপ্পোটা বলি শোন।’…

‘রবিদা’র সঙ্গে স্নেহের পৌত্র সৌম্যেন্দ্রনাথ

“জোড়াসাঁকোর বাড়িতে সাহিত্যিকদের আড্ডার আসর বসেছে। মধ্যমণি রবিদা’। রয়েছেন তদানীন্তন তাবড় তাবড় সাহিত্যিক ও পত্রিকা সম্পাদকেরা। তখন আমার তরুণ বয়স। কোনো একটা উদ্দেশ্যে হন্তদন্ত হয়ে অসাবধানবশতঃ ঢুকে পড়েছিলাম সেই ঘরে। অপ্রস্তুত হয়ে পালিয়ে আসতে গিয়ে ধরা পড়লাম রবিদা’র হাতে। আমাকে সন্ত্রস্ত করে দাঁড় করিয়ে বিশিষ্ট জনেদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বললেন, ‘আমার এই প্রতিভাবান নাতিটির সঙ্গে তোমাদের পরিচয় করিয়ে দিই। এর জন্মলগ্নে দেবী সরস্বতী এর হাতে একটি বীণা তুলে দিয়েছিলেন। কিন্ত ও তাতে সুরসঙ্গত না করে সেটিকে সামান্য একটি বংশদন্ড জ্ঞান করছে এবং জনগণের মঙ্গলার্থে তাদের ওপর প্রয়োগে উদ্যত হয়েছে।’… সমবেত হাস্যপরিহাসে বিপর্যস্ত আমি কোনোক্রমে সেদিনকার গুণীজনসমাবেশ থেকে পালিয়ে বেঁচেছিলাম।”

জলযোগ ও স্বল্প সময়ের আলাপচারিতার শেষে ওঁরা পৌঁছলেন পাঠাগার প্রাঙ্গণের সভাস্থলে। ওঁদের অনুসরণ করে আমিও। সেদিন সৌম্যেন্দ্রনাথের বক্তৃতার বিষয় ছিল ‘বাঙালির আঠারো শতকের নবজাগরণ’। দীর্ঘ সময় ধরে বলেছিলেন। আমার তখনকার বয়সটা বক্তৃতা শুনে উপভোগ করার উপযুক্ত ছিল না। তবু আজও নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, জীবনে বহু বিশিষ্টজনের বহু বক্তৃতা, বহু আলোচনা শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। কিন্তু জলদমন্দ্র অথচ সুরেলা কণ্ঠস্বরে, নিখুঁত শব্দচয়নে, কবিতার মতো স্বতঃস্ফূর্ত শব্দঝংকারে, ইতিহাসের বর্ণনার নাটকীয় উপস্থাপনায় যে অভিভাষণ সেদিন কিশোর বয়সে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনেছিলাম, তার সঙ্গে তুলনীয় কিছু শোনার অভিজ্ঞতা বিগত পঞ্চাশ বছরে আমার হয়নি।

আশ্চর্যের বিষয় এই যে, সেদিনের পর কিছুদিন আমার তরুণ মনের আকাশ এতটাই দখল করে নিয়েছিলেন সৌম্যেন্দ্রনাথ, যে বাড়ির গুরুজনেদের কাছে রীতিমতো আবদার করে এরপর আরও দুটি অনুষ্ঠানে ছুটে গিয়েছিলাম সৌম্যেন্দ্রনাথের কথকতা শোনবার জন্যে। তার মধ্যে একটি জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির প্রাঙ্গণে বৈতানিকের গীতিআলেখ্যে গ্রন্থিকের অনবদ্য ভূমিকায়।

তরুণ সৌম্যেন্দ্রনাথ

একটা ছোট্ট মজার ঘটনা দিয়ে আজকের স্মৃতির ঝাঁপি বন্ধ করব। সেদিনের সভায় উপস্থিত বিপুল জনতাকে এক অসামান্য বক্তৃতায় মন্ত্রমুগ্ধ করে বিদায় নেবার সময় আপাতদৃষ্টিতে গুরুগম্ভীর মানুষটি হঠাৎ যেন কিঞ্চিৎ খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এলেন। আগরপাড়া পাঠাগারের নামাঙ্কিত ফলকটির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে উপস্থিত কর্মকর্তাদের বললেন, “একটা কথা বলি তোমাদের, সংগঠনের নামটা ‘আগরপাড়া পাঠাগার’ না হয়ে ‘আগরপাড়া গ্রন্থাগার’ হলে বোধহয় ভাল হত। বলা তো যায় না, আজকাল যেমন সব দুষ্টু ছেলেদের উৎপাত বেড়েছে, কোনদিন ‘প’-এর ওপর ছোট্ট একটা চন্দ্রবিন্দু বসিয়ে দিলে যে বড্ড বিপত্তি ঘটবে!”

বলা বাহুল্য, কিছুক্ষণ আগের অমন প্রজ্ঞাবান সুগম্ভীর মানুষটির মধ্যেই একটি হালকা মজার রসিক মানুষের পরিচয় পেয়ে আমোদিত হয়েছিলেন সেদিনের আয়োজকেরা।

আপনি এই পত্রিকা পড়ছেন জেনে ভাল লাগল।

নতুন লেখা বা ভিডিও সংযোজন, অথবা রবিচক্রের অন্যান্য খবরাখবর সম্পর্কে জানতে, ইমেল নথিভুক্ত করতে পারেন।

We don’t spam! Read our privacy policy for more information.


0 0 votes
Article Rating
5 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Shouvik
Shouvik
1 year ago

সাধু সাধু। এমন স্মৃতি কথায় আপনার ঝাঁপি পুর্ন সে কথা এই দীন জানে। অনুগ্রহ করে অন্য পাঠক দের বঞ্চিত করবেন না। আমাদের সঙ্গে করে ওপারে কিছুই নিয়ে যাবার নিয়ম নেই। তাই বিলিয়ে দিয়ে যান।

তন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়
তন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়
Reply to  Shouvik
1 year ago

আমার সামান্য জীবনে কিছু গুণীজন সান্নিধ্য আমার অর্জন নয়, সৌভাগ্য মাত্র। আপনাদের কাছে মণিকোঠায় জমিয়ে রাখা সেসব স্মৃতি পরিবেশন করে আনন্দদান, সে‍ও তো আমার সৌভাগ্য ছাড়া আর কিছু নয়।

তন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়
তন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়
Reply to  Shouvik
1 year ago

আপনাদের প্রেরণাতেই তো ঝাঁপি খুলে সুখস্মৃতিগুলো কিছুটা ঝেড়েমুছে বার করতে ইচ্ছে করে।

Sulata Bhattacharya
Sulata Bhattacharya
1 year ago

“যে পারে সে আপনি পারে
পারে সে ফুল ফোটাতে।”

সময়ের মরুপথ পারকরে আসা কৈশোরিক স্মৃতিকে এমন নবীন
এমন সরস করে পরিবেশন করার জন্য সাধুবাদ জানাই আপনাকে।

তন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়
তন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়
Reply to  Sulata Bhattacharya
1 year ago

অশেষ ধন্যবাদ।