
(এক)
● কবি নজরুলকে
ওগো দুর্বাসা! বাজাবে না সুর আগুনের জ্বালা মাখা?
দেখাবে না আর অন্ধ আকাশে জ্বলে ‘ধূমকেতু’-লেখা?
জ্বলন্ত শিখা যৌবন-ছবি টকটকে রঙে আঁকা,
উগ্র গরল – নীলকন্ঠের বিরাট বেদনা ঢাকা –
মহাউদ্গার-জ্বালা নিয়ে শুধু ঘুরবে কালের চাকা?
সংগীতধ্বনি শোনে নাকো আজ কেউ সিন্ধুর রোলে,
‘বাঁশের বাঁশি’র উদাস সে সুর কখন যে গেছি ভুলে!
‘ছায়ানট’! আজ বাঁশি বাজে নাকো এই গঙ্গার কুলে,
‘খোঁপায় তারার ফুল’ নিয়ে প্রিয়া তোমার আজ ঘুমে ঢ’লে —
জাগাবে না কবি এদের তোমার সেই ‘হিন্দোলা দোলে’?
‘লৌহ কপাট’ ভাঙেনি, এখনো অনেক ‘অন্ধকূপ’ —
‘এক বৃন্তে’র ফুলগুলি ঝরে হয়ে আছে আজ স্তুপ!
হে তাপস! তুমি দু’ নয়ন মুদে দেখেছ সে কোন রূপ!
বলবে না দেখে কোন ‘ধ্রুবজ্যোতি’ হয়ে গেছ নিশ্চুপ?
শুধু পুড়ে যাবে আপনার মনে ‘গন্ধবিধুর ধূপ’?
বলবে না কথা? ফেরাবে না মুখ? শুধরে দেবে না ভুল?
অভিমানভরে তাকিয়ে থাকবে অবুঝ-বেদনাকুল!
শ্যামা বাংলায় হে শ্যামা-সাধক, গাইবে না বুলবুল?
তাই থাকো কবি, ডাগর নয়নে চেয়ে থাকো নজরুল —
ও চোখের জ্বালা, ফোটাবে খরায় ‘দোলনচাঁপা’র ফুল!

(দুই)
● জীবন মৃত্যুর চারণকে
তোমার জীবনের দিকে তাকালে বুঝতে পারি —
অর্থ ছিল না কোন এই জীবনধারণের,
ডাগর চোখের বোবা চাউনি ও কম্বুকণ্ঠে স্তব্ধতা নিয়ে
বেঁচে থেকেও তুমি ছিলে মৃত —
তাই আজ কী বা তাৎপর্য এই অবসানের !
আমাদের জীবনের দিকে তাকালে বুঝতে পারি –
বাংলা নামে এই আবহমান ভূখণ্ডে এতদিন
তুমি ছিলে ভীষণভাবে জীবিত–
প্রাণে প্রাণে গানে তানে, অমোঘ অভীক উচ্চারণে,
যেমন এখনো আছ, থাকবে —
ঢেউ তুলবে সমতালে গঙ্গা-গোমতীতে,
তাই এই মৃত্যু আজ কত অকিঞ্চিৎকর।
জীবন মৃত্যুর ঊর্ধ্বে ইতিহাসের দিকে যখন তাকাই —
তখন মূক চৌত্রিশ বছরের না ফোটা সম্ভাবনার জন্য আফসোস হলেও
ভাবি তোমার ওই পদ্মপলাশ চোখ ও কম্বুকন্ঠ ভাষাহারা ছিল ভাগ্যিস —
তাই দেখতে হলো না সম্মানের নাগরিকত্বের খেলা,
‘শূন্য এ বুকে ফিরে আয়’ বলে
চুরুলিয়ার প্রান্তরের হাহাকার শুনতে হল না!
মহাবিহঙ্গ, যেখানে বন্ধ করলে তোমার পাখা,
ছলনা চাদরে ঢাকা সে নগরীর নামও যে ঢাকা!
নীরেন্দ্রনাথ বলেছিলেন … কবি তুমি গদ্যের সভায় যাবে? পা যেন টলেনা। তো বাবু অলক রঞ্জন যখন যে দিকে ইচ্ছে পা বাড়িয়ে দেন। তিনি টলেন না, পাঠক কে নাড়িয়ে দেন। ছন্দ বদ্ধ আর ছন্দ বন্ধ দুই তীরেই তার পানসি বাঁধা। সেলাম জানাই।